রাজনীতি

মেয়াদ শেষের আগেই ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ কমিটি পুনর্গঠনের চিন্তা বিএনপির

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির কমিটি পুনর্গঠন করা হতে পারে বলে জোর আলোচনা চলছে দলটির বিভিন্ন স্তরে।

রাজধানীতে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো শক্তিশালী ও গতিশীল করতে নতুন নেতৃত্ব আনার বিষয়ে দলটির হাইকমান্ড নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এবং তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে- এমন নেতাদেরই নতুন কমিটিতে প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়। 

ঢাকা মহানগর বিএনপির শীর্ষ পদে দেখা যেতে পারে, এমন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় থাকা কয়েকজন নেতার সঙ্গেও কথা বলেছে রাইজিংবিডি ডটকম।

বিএনপির হাইকমান্ড বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের পাশাপাশি সংগঠন পুনর্গঠনের কাজেও গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, জেলা-মহানগরসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিট ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথমে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, পরে মূল দলের বিভিন্ন ইউনিট পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। 

তবে রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির কমিটি দ্রুত পুনর্গঠন করা হতে পারে। অবশ্য দিন-তারিখের বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। যদিও এই দুই কমিটির শীর্ষ পদে কারা আছেন, সেটি সবস্তরেই গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের পর দলকে সাংগঠনিকভাবে গতিশীল করতে চায়। এর অংশ হিসেবে দলের ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি থেকে শুরু করে সব অঙ্গ সংগঠনকে ঢেলে সাজানো হবে। এরই ধারাবাহিকতায় গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিট ঢাকা মহানগর উত্তর ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির কমিটিকেও পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

নেতারা বলছেন, ২০১৬ সালের পর এবার জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি, যা চলতি বছরের মধ্যে হতে পারে। এর আগে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, মহানগর ও জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো পুনর্গঠনের মাধ্যমে সংগঠনকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, “বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোকে আরো কার্যকর করতে পুনর্গঠনের কাজ দ্রুত শুরু হবে। সাংগঠনিক গতিশীলতা বাড়াতে শিগগির জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে।”

ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি কবে নাগাদ হতে পারে, সে বিষয়ে কথা হয় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে। অবশ্য তিনি বলেছেন, নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্তের কথা তার জানা নেই।

রাইজিংবিডি ডটকমকে রিজভী বলেন, “আমার কাছে অফিসিয়ালি এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তবে সংগঠনের গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন আসতেই পারে; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।” 

২০২৪ সালের ৭ জুলাই ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই সময়ে দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটিতে রফিকুল আলম মজনুকে আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিব করা হয় তানভীর আহমেদ রবিনকে। 

ঢাকা মহানগর উত্তরে আহ্বায়ক করা হয় জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নিরবকে, সদস্য সচিব করা হয় আমিনুল হককে। তবে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগে পরবর্তীতে মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি ভেঙে দিয়ে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর আমিনুল হককে আহ্বায়ক ও মোস্তফা জামানকে সদস্য সচিব করে নতুন কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ফেনী-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আসন বিবেচনায় তাকে নিজ এলাকায় বেশি সময় দিতে হচ্ছে। এ কারণে তিনি ঢাকা মহানগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিটে তেমন সময় দিতে পারছেন না। তবে মজনু দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ায় তার সাংগঠনিক অবদানও ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

বর্তমান কমিটির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে ও তার পরিবারকে কারা-নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পছন্দের তালিকায় রয়েছেন রবিন। 

২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের আন্দোলনে যখন দল ও সংগঠনের বেশির ভাগ নেতা কারাবন্দি কিংবা আত্মগোপনে চলে যান, তখন ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন লিটন মাহমুদ। নেতাকর্মীদের খোঁজ-খবর রাখা, সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নে তার সক্রিয়তা তাকে সাধারণ সম্পাদক পদের দৌড়ে এগিয়ে রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। আন্দোলনে তার ভূমিকার জন্য দলের চেয়ারম্যানের সুনজরে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এর বাইরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির শীর্ষ পদে আলোচনায় আছেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক এনামুল হক এনামসহ বেশ কয়েকজন।

জানতে চাইলে তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, “দলের কমিটি গঠন সম্পূর্ণভাবে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এখতিয়ার। তবে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন এবং কঠিন সময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন, দল নিশ্চয়ই তাদের মূল্যায়ন করবে।”

“আমরা সবসময় সংগঠনকে শক্তিশালী করতেই কাজ করছি,” বলেন তিনি।

ঢাকা মহানগর উত্তর পর পর দুইবার মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালনের পর আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন সাফ গেমস বিজয়ী ফুটবলার আমিনুল হক। তিনি বিভিন্ন মেয়াদে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। 

২০২১ সালের আগস্টে ডাকসুর সাবেক ভিপি আমান উল্লাহ আমানকে আহ্বায়ক ও আমিনুল হককে সদস্য সচিব করে কমিটি গঠন করে বিএনপি। পরে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সাইফুল আলম নিরব আহ্বায়ক হলে তিনি আবার সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর একই বছর ৪ নভেম্বর ঘোষিত আংশিক আহ্বায়ক কমিটিতে আমিনুল হককে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়। এরসঙ্গে বর্তমানে তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। সাংগঠনিক দিক বিবেচনায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি পদে তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।

একাধিক নেতা জানান, প্রতিমন্ত্রী হলেও আমিনুল হক মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছেন। তার নেতৃত্বে উত্তর বিএনপি নতুন গতি পাবে বলে আশা করছেন তারা।

সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। দীর্ঘদিন ধরে মহানগর উত্তরের আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। 

কথা হলে রাইজিংবিডি ডটকমকে এস এম জাহাঙ্গীর বলেন, “দল সবসময় যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও পরীক্ষিত নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করে। যারা দীর্ঘদিন রাজপথে ছিলেন এবং সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন, তাদের নিয়েই শক্তিশালী টিম গঠন হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। সরকার ও সংগঠনের কাজ সমন্বয় করেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব।”

মহানগর উত্তরে আলোচনায় আছেন মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন, আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, এ বি এম আব্দুর রাজ্জাক, কফিল উদ্দিন আহমেদ, মামুন হাসান ও এ জি এম শামসুল হক।

মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক হতে আগ্রহী কফিল উদ্দিন আহমেদ রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আওয়ামী ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সোচ্চার ছিলাম। রাজনীতি করতে গিয়ে হামলা মামলার শিকার হয়েছি। বিভিন্ন সময় মহানগরীর নেতৃত্বে ছিলাম। ওয়ার্ড ছাত্রদল থেকে রাজনীতিতে পথচলা শুরু।”

“আমাদের অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে নির্দেশনা দেবেন, সেভাবেই কাজ করব,” বলেন তিনি।