রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা ছিল নাম। ২০২৩ সালে এর নাম পরিবর্তন করে করা হয় রাজশাহী বোটানিক্যাল গার্ডেন। আবারো নাম পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন। এখন শুধু প্রাণী মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষা। নতুন নাম হবে ‘রাজশাহী বার্ড পার্ক’।
এই পার্কটিতে এখন হাতে গোনা কয়েকটি প্রাণী আছে। এর মধ্যে দুটি ঘড়িয়াল আর শ’খানেকের মতো কবুতর। আছে চিত্রা হরিণ। বেশি প্রাণী না থাকায় এই পার্ক প্রবেশের জন্য দর্শনার্থীদের টিকিট বিক্রির টাকা থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে কোনো মতে টিকিয়ে রাখা হয়েছে প্রাণীগুলোকে। তবে, হরিণগুলো বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি হরিণ থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী বোটানিক্যাল গার্ডেনের এই জায়গাটি ব্রিটিশ আমলে ছিল ঘোড়দৌঁড়ের মাঠ। ঘোড়দৌঁড় বন্ধ হওয়ার পর এই মাঠটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত ছিল। সে সময় কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে এর কার্যক্রম শুরু হয়। পরে উদ্যানে মূল্যবান গাছের চারা রোপণ, ফুল গাছের কোয়ারি ও কুঞ্জ তৈরি, লেক ও পুকুর খনন, কৃত্রিম পাহাড় তৈরির কাজ ১৯৭৪ সালে শুরু হয়।
দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পশুপাখি এনে উদ্যানটি বিনোদনের উপযোগী করা হয়। এরপর থেকে চিড়িয়াখানা নামেই পরিচিত ছিল।
চিড়িয়াখানায় এক সময় বাঘ, সিংহসহ অনেক পশুপাখি ছিল। ১৯৯৭ সালে ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে ৬ বছর বয়সের একটি বাঘ আনা হয়। নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়ে ২০০৮ সালে বাঘটি মারা যায়। আগে, চিড়িয়াখানায় একটি সিংহ ও একটি সিংহী ছিল। ২০১৩ সালে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে সিংহী মারা গেলে কয়েক মাস পর সিংহটিও মারা যায়। সচিড়িয়াখানায় একসময় উট ও হায়না ছিল। ভালুকের জন্য ছিল একসঙ্গে যুক্ত দুটি নতুন খাঁচা।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে অসুস্থ হয়ে ভালুকটি মারা যায়। এখন শুধু হরিণের খাঁচায় কয়েকটি হরিণ আছে। পশুপাখিদের মধ্যে স্বপ্নপুরী পার্কে অনুদান হিসেবে দুটি বেবুন, ১৩টি বানর, তিনটি হনুমান, একটি অজগর ও দুটি মদনটাক পাখি দেওয়া হয়েছে। একটি মায়া হরিণ স্বপ্নপুরী পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) সূত্র জানায়, রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যানটি রয়েছে প্রায় ৩৩ একর জায়গাজুড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ৩ একর জায়গার ওপরে বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটর করা হলে এর আয়তন কমে যায়। এছাড়াও এখানে করা হয়েছে একটি রিসোর্ট। তবে এতো ছোট আকারের জায়গায় চিড়িয়াখানা বা উদ্যান গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ফলে এটিকে এখন বার্ড পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাসিক। এখন প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই দ্বিতীয় বারের মতো এই পার্কটির নাম পরিবর্তন করা হবে।
বিগত সরকারের আমলে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্কটির সাজসজ্জাসহ ঢেলে সাজানোও হয়, কিন্তু প্রায় ২০ বছরে এই পার্ক থেকে একের পর এক প্রাণী বিলিন হতে শুরু করে। বেশি প্রাণী না থাকায় এই পার্ক প্রবেশের জন্য দর্শনার্থীদের টিকিট বিক্রির টাকা থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে কোনো মতে টিকিয়ে রাখা হয়েছে প্রাণীগুলোকে।
রাসিকের ভেটেনিরা সার্জন ডা. ফরহাদ উদ্দিন বলেন, “নাম পরিবর্তনসহ প্রকল্প বরাদ্দ দিতে প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় যদি বিষয়টি অনুমোদন করে তাহলে তারা পরিদর্শন শেষে প্রকল্প বরাদ্দ দিলে আমরা নতুন করে পার্কটিকে ঢেলে সাজাব। সে ক্ষেত্রে পাখিদের বাসা বানানো, পাখি কেনা এবং অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হবে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ১০-১৫ জাতের নানা রঙয়ের পাখি রাখা হবে।”
তিনি বলেন, “এখন এ পার্কে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ৪৯টি হরিণ বেশি আছে। বন বিভাগের অনুমোদন স্বাপেক্ষে কেউ এই হরিণগুলোকে পালন করতে চাইলে আমরা অতিরিক্তগুলো বিক্রি করে দেব। করোনার পর থেকে এই রকম কোনো সৌখিন মানুষ আমরা পাইনি।”
ডা. ফরহাদ উদ্দিন বলেন, “সিলেটের জালালাবাদ প্যারা কমান্ড ইউনিট ৫টি হরিণ চেয়ে একটি চিঠি আমরা পেয়েছি। সেখানে প্রাণীদের একটি অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হবে। তাই তারা ৫টি হরিণ চেয়েছে। এর মধ্যে দুটি হরিণের নির্ধারিত মূল্য ৫০ হাজার করে এক লাখ টাকা পরিশোধ করতে চেয়েছে তারা। আর তিনটি অনুদান হিসেবে চেয়েছে। ৫টি হরিণ দিলে আমাদের পার্কে আরও ১২৪টি হরিণ থাকবে।”
এই কর্মকর্তা জানান, বনবিভাগের নিয়ম অনুযায়ী একটি হরিণের জন্য অন্তত ৫০০ স্কয়ার ফিট জায়গার প্রয়োজন হয়। রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যানে হরিণের যে সেড আছে, সেখানে প্রায় ৪০ হাজার স্কয়ার ফিট জায়গা রাখা আছে। সেই হিসেবে ৮০টির মতো হরিণ ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। হরিণ রয়েছে ১২৯টি। এতো বাড়তি হরিণের খাবার দেওয়াও আমাদের জন্য একটু ব্যয়বহুল হচ্ছে। তাই বাড়তি হরিণগুলো আমরা নির্ধারিত ৫০ হাজার টাকা মূল্যে বিক্রি করতে চাই। এই হরিণ যিনি কিনবেন, শুধু বন বিভাগের অনুমতি স্বাপেক্ষে লালন-পালনের জন্য কিনতে পারবেন। কোনোভাবেই হরিণ জবাই করা যাবে না। সেই শর্তে বিক্রি করা হবে।”
রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যানে এখন দুটি ঘড়িয়ালও আছে। এর মধ্যে একটি পুরুষ একটি নারী। পুরুষ ঘড়িয়ালটির নাম গড়াই ও নারী ঘড়িয়ালটির নাম পদ্মা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে নারী ঘড়িয়াল একটি ডিমও দিয়েছিল। কিন্তু সেটি কেউ টের পাইনি। ফলে ডিমগুলো ঘড়িয়ালের পুকুরে পড়ে ডুবে যায়। এরপর পঁচে এক সময় একটি ডিম ভেসে উঠলে বিষয়টি টের পান উদ্যানের দায়িত্বরত কর্মচারিরা।
বছরে একবার ঘড়িয়ালের প্রজনন ক্ষমতা হয় বলেও জানান রাসিকের ভ্যাটেনিরারি সার্জন ড. ফরহাদ উদ্দিন। তিনি বলেন, “আমরা এখন সতর্ক আছি। এবার ইনকিউবেটরে বা অন্য কোনো মাধ্যমে সেই ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর চেষ্টা করা হবে।”