আটলান্টিক মহাসাগরে ভ্রমণরত ডাচ ক্রুজ জাহাজ এমভি হন্ডিয়াস–এ হান্টাভাইরাস সংক্রমণে তিনজনের মৃত্যু এবং আরও কয়েকজন আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এখনই কোনো বৈশ্বিক মহামারির ইঙ্গিত নয়। তারপরও প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশে কি এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে?
কীভাবে আলোচনায় এলো হান্টাভাইরাস? প্রায় এক মাস আগে আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া শহর থেকে যাত্রা শুরু করে বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজ ‘এমভি হন্ডিয়াস’। জাহাজটিতে ২৮টি দেশের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। যাত্রাপথে একে একে তিনজন যাত্রীর মৃত্যু হয়।
পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিশ্চিত করে, মৃতদের অন্তত একজন হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। পরে আরও কয়েকজনের শরীরে ভাইরাসটির অ্যান্ডিস স্ট্রেইন শনাক্ত হয়, যা মানুষ থেকে মানুষে সীমিতভাবে ছড়াতে পারে।
আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা যাত্রীরা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশে ফিরে গেছেন। ফলে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখন সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তে কাজ করছে।
হান্টাভাইরাস কী? হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর শরীরে থাকা এক ধরনের ভাইরাস। সাধারণত আক্রান্ত ইঁদুরের মল, প্রস্রাব বা লালা শুকিয়ে বাতাসে মিশে গেলে সেই কণা শ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়। বিরল ক্ষেত্রে ইঁদুরের কামড় বা আঁচড় থেকেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।
এই ভাইরাসে কী ধরনের রোগ হয়? হান্টাভাইরাস সাধারণত দুই ধরনের গুরুতর অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে—
১. হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম এতে শুরুতে দেখা যায়:
জ্বর ক্লান্তি পেশিতে ব্যথা পরে দেখা দিতে পারে: শ্বাসকষ্ট মাথা ঘোরা পেটের সমস্যাশ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতা দেখা দিলে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
২. হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম এটি কিডনিকে বেশি আক্রান্ত করে। এতে হতে পারে:
নিম্ন রক্তচাপ অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ কিডনি বিকলতামানুষ থেকে মানুষে কি ছড়ায়? সাধারণত হান্টাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। তবে অ্যান্ডিস স্ট্রেইন নামে একটি ধরনে সীমিত মানব-সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ডব্লিউএইচও বলছে, এই ভাইরাস:
কোভিড-১৯ এর মতো দ্রুত ছড়ায় না হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক নয় মূলত ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘ সংস্পর্শে ছড়াতে পারেডব্লিউএইচওর সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভেন কারখোভ বলেছেন, “এটি কোভিড নয়, ইনফ্লুয়েঞ্জাও নয়—এটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ছড়ায়।”
বাংলাদেশে ঝুঁকি কতটা? বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত হান্টাভাইরাসের বড় কোনো প্রাদুর্ভাবের তথ্য নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ: দেশে ইঁদুরের উপস্থিতি ব্যাপক, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি সবসময় মানা হয় না, খাদ্যগুদাম, বাজার ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ইঁদুর সহজে বংশবিস্তার করে তবে তবে বর্তমানে বাংলাদেশে এই ভাইরাসের সক্রিয় সংক্রমণের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কেন আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই?
ভাইরাসটি খুব সহজে বাতাসে ছড়ায় না সাধারণ সামাজিক মেলামেশায় সংক্রমণের ঝুঁকি কম অধিকাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ইঁদুরের সংস্পর্শই প্রধান কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সামগ্রিক ঝুঁকিকে “কম” হিসেবে মূল্যায়ন করেছেকীভাবে সতর্ক থাকবেন? বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা মানার পরামর্শ দিচ্ছেন:
ঘরবাড়ি ও খাদ্য সংরক্ষণের স্থান পরিষ্কার রাখা ইঁদুরের মল বা প্রস্রাব পরিষ্কার করার সময় গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করা বন্ধ ঘর দীর্ঘদিন পরে খুললে আগে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা ইঁদুরের উপদ্রব কমাতে ব্যবস্থা নেওয়া জ্বর ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এমভি হন্ডিয়াসে ছড়িয়ে পড়া ঘটনা “মহামারির সূচনা নয়”। সংস্থাটির মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেছেন, সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি এখনো কম। তবে ভাইরাসটির ইনকিউবেশন সময় ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে বলে আরও কিছু সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি