প্রায় দুই দশক ধরে ধান চাষ করছেন ঢাকার ধামরাই উপজেলার মাদারপুর এলাকার কৃষক আব্দুস সালাম। চলতি মৌসুমে ৯০ শতাংশ জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। এ সপ্তাহে পাকা ধান ঘরে তুলেছেন। এখন হিসাব মেলাতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় এই ষাটোর্ধ্ব কৃষক।
নিজের হিসাব তুলে ধরে আব্দুস সালাম জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার তিনদিনে ১১০০ টাকা করে ২২ জন শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে তার খরচ হয়েছে ২২ হাজার টাকা। ধান মাড়াইয়ে গেছে আরো ২ হাজার ৭০০ টাকা। সেচ ও জমি প্রস্তুতে খরচ হয়েছে ১০ হাজার টাকা, সার বাবদ ১২ হাজার এবং রোপণের সময় ৮০০ টাকা করে ১০ জন শ্রমিককে মজুরি দিতে হয়েছে আরো ৮ হাজার টাকা। নিজের শ্রমের মূল্য বাদ দিয়েই মোট খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা।
তিনি জানান, ৯০ শতাংশ জমি থেকে প্রায় ৬০ মণ ধান পেয়েছেন। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকায়। সে হিসেবে ধানের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে কিছু খড় মিলবে। তিন মাসের বেশি সময় ধরে চাষাবাদের পর লাভের অংক খুবই সামান্য বলে মনে করছেন তিনি।
গত সপ্তাহ থেকে ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটা শুরু হয়েছে। কয়েক দফা বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে অনেক স্থানে ধান কাটায় বিঘ্ন ঘটে। কোথাও জমিতে পানি জমে যাওয়ায় হারভেস্টার নামানো যায়নি। ফলে শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে গেছে, বেড়েছে মজুরিও।
মাদারপুরের কৃষক আব্দুস সালাম ১১০০ টাকায় শ্রমিক পেলেও অনেক কৃষককে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত দৈনিক মজুরি দিতে হয়েছে।
ধান কাটায় ব্যস্ত ধামরাইয়ের দুই কৃষক
উপজেলার বড় নারায়ণপুর এলাকার কৃষক মো. হোসেন আলী ১৫ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, “গত শনিবার ছয়জন শ্রমিক দিয়ে জমির একাংশের ধান কাটাতে হয়েছে। প্রতিজনকে ১৫০০ টাকা করে মজুরি এক দিনেই খরচ হয়েছে ৯ হাজার টাকা।”
গাংগুটিয়া ইউনিয়নের বড়নালাই এলাকার কৃষক নবীন ব্যাপারী বলেন, “শ্রমিকের হাটে শ্রমিক নেই। যারা আছে তারাও অতিরিক্ত টাকা চাইছে। কোনো বেলায় শ্রমিকের বাজার ১২০০, আবার কোনো বেলায় ১৫০০ টাকা। এক মণ ধানের চেয়েও শ্রমিকের দাম অনেক বেশি।”
ধান চাষে এখন আর লাভের সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন কৃষকেরা। আব্দুস সালাম বলেন, “এক সময় ধান চাষে লাভ থাকলেও বর্তমানে হিসাব অনেকটাই বরাবর। লাভের চেয়েও এখন ধান চাষের বড় কারণ বছরের পুরো ধান পাওয়া।” তার মতে, শ্রমিক ও সারের দাম বেড়ে যাওয়া এবং ধানের দাম কম থাকাই এ অবস্থার মূল কারণ।
ধামরাইয়ের রোয়াইল এলাকার কৃষক জসীম উদ্দিন বলেন, “ধানে লাভ নেই, আসে শুধু খাওয়ার যোগান।”
তিনি বলেন, “জমি তো পতিত রাখা যাবে না। চাষ তো করতে হবে, তাই ধান করি। শ্রমিক সংকট দূর করা এবং সারসহ অন্যান্য উপকরণের খরচ কমানো গেলে ধান চাষ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। না হলে অনেকেই ধান চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।”
কৃষকদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য লাকী আক্তার বলেন, “কৃষক, বর্গাচাষি ও কৃষি মজুরেরা প্রতিবছর ফসল উৎপাদন করলেও উৎপাদনের উপকরণের দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সেই তুলনায় কৃষক লাভজনক দাম তো দূরের কথা, ন্যায্যমূল্যও পাচ্ছেন না।”
তিনি বলেন, “মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্যের কারণে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে, সরকার নির্ধারিত দামে অধিকাংশ কৃষক ফসল বিক্রি করতে পারেন না; নানা শর্তের বেড়াজালে পড়ে তারা ভুক্তভোগী হন।”
সমাধান হিসেবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি উদ্যোগে ফসল কেনা, জেলা পর্যায়ে স্বল্প খরচে সরকারি হিমাগার নির্মাণ এবং কৃষিঋণ সহজ করার দাবি জানান তিনি।
লাকী আক্তার বলেন, “কৃষিকে শুধু বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে চলবে না; খাদ্য উৎপাদনকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। কৃষিতে পর্যাপ্ত ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হবে এবং কৃষিনির্ভর শিল্প কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কারণ কৃষিই বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখবে।”
বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এই সদস্য বলেন, “মার্কিন চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষি খাত আরো বিপর্যয়ে পরবে। তখন শর্তের বেড়াজালে আমেরিকার চাপে কৃষিতে ভর্তুকি কমিয়ে দেবে সরকার। তাতে কৃষকের অবস্থা আরো করুণ হবে।”
ধামরাই উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, “এ বছর উপজেলায় ১৭ হাজার ৩ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। গত বছর এ পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৯৯০ হেক্টর। চলতি মৌসুমে ৯৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টন বেশি।
ধামরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, “এখন ধানের দাম বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে ছিল এবং একই সঙ্গে উন্নত জাতের উচ্চ ফলনশীল ধান আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে চাষাবাদ করায় ফলন বেশি হবে।”
তিনি জানান, “প্রতিটি ইউনিয়নের তিনটি মাঠে ৪০ বিঘা করে জমিতে খামারি অ্যাপের মাধ্যমে সুষম সার প্রয়োগ ও নিবিড় পরিচর্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি পার্টনার প্রকল্পের এডব্লিউডি প্রযুক্তি ও ঢাকা অঞ্চল কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আধুনিক বীজ ও প্রযুক্তি সহায়তা কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে।”