তীব্র জ্বরে পুড়ে যাওয়া কপালে মায়ের রাখা হাতটা শান্তি দেবে যে কাউকে। কিন্তু এমন একটি হাতের ছোঁয়া পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি ছয় মাস বয়সী এই শিশু আরাফের। শুধু মা না জন্মের পর পায়নি বাবাকেও। দেশে ছড়িয়া পড়া হামে আক্রান্ত হয়ে আরেকবার জীবন যুদ্ধে যেন জয়ী হলো আরাফ। আর এ যাত্রায় তার পাশে ছিলেন সেবিকা শান্তা ইসলাম। তার স্নেহ, যত্ন আর নিরলস সেবাতেই হাম থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছে আরাফ।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ঢাকার মহাখালীর সাততলা এলাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বারান্দায় কোলে আরাফকে নিয়ে বসেছিলেন শান্তা। শিশুটি তখন আধো ঘুম চোখে চারদিকে তাকাচ্ছিল। শান্তা আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে, এ যেন একজন মায়ের কোলে তার সন্তান। কিন্তু কাছে গিয়ে জানা গেল অন্য গল্প।
শান্তা জানান, প্রায় তিন মাস আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শিশুটিকে আজিমপুরের সরকারি ছোটমণি নিবাসে দিয়ে যান। তখন তার নাম রাখা হয় আরাফ। শুরু থেকেই শিশুটির দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন তিনি। এখন পর্যন্ত আরাফের মা-বাবার কোনো পরিচয় মেলেনি।
তিনি বলেন, “শুরু থেকেই আরাফকে নিজের সন্তানের মতো করে দেখাশোনা করছি। ছোট্ট একটা শিশু, কারও পরিচয় নেই অযত্নে তো ফেলে রাখা যায় না।”
গত ৩০ এপ্রিল হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয় আরাফ। পরে শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে তাকে দ্রুত মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটি হাম আক্রান্ত।
এরপর শুরু হয় দুই সপ্তাহের লড়াই। হাসপাতালের বেডে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিটি মুহূর্তে আরাফের পাশে ছিলেন শান্তা। ওষুধ খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, কোলে নেওয়া সবকিছুই করেছেন মায়ের মতো যত্নে।
শান্তা বলেন, “রাতে ঘুম ভেঙে কাঁদলে কোলে নিয়ে বসে থাকতাম। অসুস্থ থাকায় খুব কষ্ট পেয়েছে। এখন অনেকটাই ভালো আছে।”
হাসপাতালের পরিবেশে যেখানে সব শিশুই বাবা-মায়ের হাতে চিকিৎসা নেয়, সেখানে আরাফের একমাত্র ভরসা ছিলেন সেবিকা শান্তা।
চিকিৎসা শেষে এখন হামমুক্ত আরাফ। ফিরে যাচ্ছে ছোটমণি নিবাসে। তবে তার ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। তবুও ছোট্ট এই শিশুটির সুস্থতা যেন কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে শান্তার।
গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত সারাদেশে হামে মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৫৬ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭ হাজার ১৫০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৬৯ জন নিশ্চিত রোগী এবং ৩৬৩ জন সন্দেহজনক রোগীসহ মোট ৪৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে।