দেহঘড়ি

টিকা শরীরে কীভাবে কাজ করে

শত শত বছর ধরে মানুষ ইনোকুলেশন বা দেহে অল্প পরিমাণ দুর্বল ভাইরাস প্রবেশ করানোর পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। যাতে কোনো রোগের বিস্তার রোধ করা যায়। সুস্থ শরীর ওই দুর্বল জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং সেটিকে প্রতিহত করে।

১৭০০-এর দশকে তুরস্ক থেকে এই পদ্ধতি ইংল্যান্ডে আনা হয়। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে আরও উন্নত করা হয়েছে যা   আজ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা উপকরণগুলোর একটি। যখন একটি সম্প্রদায়ের যথেষ্ট সংখ্যক মানুষ কোনো রোগের বিরুদ্ধে টিকা নেয়, তখন তারা শুধু নিজেরাই সুরক্ষিত থাকে না, বরং ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা ‘গোষ্ঠীগত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা’ও তৈরি করে।

হার্ড ইমিউনিটি কী? একটি সম্প্রদায়কে যদি পশুর একটি পাল হিসেবে কল্পনা করা হয়, তাহলে হার্ড ইমিউনিটি হলো এমন একটি ঢাল, যা পুরো পালকে সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করে। যখন একটি বড় অংশের মানুষ রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, তখন সেই ঢাল আরও শক্তিশালী হয় এবং রোগ এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির মধ্যে সহজে ছড়াতে পারে না। এই পরোক্ষ সুরক্ষা বিশেষভাবে উপকার করে তাদের, যারা চিকিৎসাজনিত কারণে টিকা নিতে পারেন না।

হার্ড ইমিউনিটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? হার্ড ইমিউনিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নবজাতক শিশু, ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছেন এমন ব্যক্তি বা দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের মতো ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোকে সুরক্ষা দেয়। এদের অনেকের শরীর টিকা বা পূর্বের সংক্রমণের মাধ্যমে যথেষ্ট শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। সম্প্রদায়ের মধ্যে রোগের বিস্তার কমিয়ে হার্ড ইমিউনিটি তাদের চারপাশে এক ধরনের সুরক্ষাবলয় তৈরি করে।

হার্ড ইমিউনিটির ধারণা বহু পুরোনো। তবে মানুষ এটিকে আরও কার্যকর করার উপায় বের করেছে।

প্রাকৃতিক সংক্রমণজনিত রোগপ্রতিরোধ কেউ সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে উঠলে তার শরীর ভবিষ্যতের সংক্রমণের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক প্রতিরোধ তৈরি করে। তবে এর একটি মূল্য আছে। কারণ প্রথম সংক্রমণটি নিজেই অসুস্থতা, জটিলতা এমনকি গুরুতর ঝুঁকির কারণ হতে পারে। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মাঝেও রোগ ছড়িয়ে দিতে পারেন।

টিকা যেভাবে কাজ করে টিকা হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের নিরাপদ ও কার্যকর উপায়। টিকায় দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হয়, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আসল জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ দেয়, কিন্তু রোগ সৃষ্টি করে না। এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক সংক্রমণের ঝুঁকি ছাড়াই রোগপ্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

টিকার মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন টিকাদান কর্মসূচি হার্ড ইমিউনিটি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, যখন জনগণের বড় অংশ ফ্লুর টিকা নেয়, তখন রোগ বহন ও ছড়াতে সক্ষম মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে পুরো সম্প্রদায়ের জন্য একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি হয়।

যদিও কিছু মানুষের স্বাস্থ্যগত কারণে টিকা নেওয়া সম্ভব হয় না, অধিকাংশ মানুষের জন্য টিকা নিরাপদ ও কার্যকর হিসেবে পরীক্ষিত। শিশুদের খুব ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত চিকিৎসা পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন টিকা দেওয়া হয়, যা তাদের শৈশবের নানা রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়।

প্রাপ্তবয়স্করাও প্রতিবছরের ফ্লু টিকা নেওয়ার সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেরা এবং আশপাশের মানুষকে একটি সাধারণ কিন্তু প্রাণঘাতী সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারেন, যা প্রতি বছর হাজার হাজার আমেরিকানের মৃত্যু ঘটায়।

ভবিষ্যতে আরও নতুন টিকা আবিষ্কৃত হতে পারে, যা অন্য রোগ থেকেও সুরক্ষা দেবে। কিছু ক্ষেত্রে বুস্টার ডোজেরও প্রয়োজন হতে পারে। অধিকাংশ মানুষই কমিউনিটি ইমিউনিটির এই সুরক্ষাবলয়কে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারেন।

টিকা ছাড়া কী হার্ড ইমিউনিটি অর্জন সম্ভব? প্রাকৃতিক সংক্রমণের মাধ্যমেও হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হতে পারে, তবে এটি কোনোভাবেই সুপারিশকৃত পদ্ধতি নয়। ব্যাপক সংক্রমণ অপ্রয়োজনীয় অসুস্থতা বাড়াতে পারে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

সূত্র: ইউনিভার্সিটি হেলথ ডটকম