সাধু-সন্ন্যাসী ও বাউলদের উপস্থিতিতে জমে উঠেছিল বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের বৈশাখী উৎসব ও পুণ্যার্থী মেলা। প্রতিবছরের মতো এবারো বৈশাখের শেষ বৃহস্পতিবারকে ঘিরে সাধু-সন্ন্যাসী, বাউল ও পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছিল শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ার (রহ.) মাজার এলাকায়।
বুধবার (১৩ মে) সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মহাস্থানগড়ে আসতে শুরু করেন বিভিন্ন তরিকতের ভক্ত, আশেকান ও সাধু-সন্ন্যাসীরা। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) দিনভর গান-বাজনা ও আধ্যাত্মিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে চলে মিলনমেলার উৎসব।
পুন্ড্রনগরী মহাস্থানগড়েরর ইতিহাস থেকে জানা যায়, মধ্য এশিয়ার বল্লখ রাজ্য থেকে হজরত শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ার (রহ.) শিষ্যদের নিয়ে ফকির বেশে মাছ আকৃতির একটি নৌকায় চড়ে মহাস্থানগড়ে আসেন। মাছ আকৃতির নৌকায় আগমনের কারণে তিনি ‘মাহিসাওয়ার’ এবং বল্লখ থেকে আগত হওয়ায় ‘বলখী’ নামে পরিচিতি পান। এখানে এসে তিনি ইসলামের দাওয়াত প্রচার শুরু করেন।
প্রথমে রাজা পরশুরামের সেনাপ্রধান, মন্ত্রী ও কিছু সাধারণ মানুষ ইসলামের বার্তা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পুন্ড্রবর্ধনের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করলে রাজা পরশুরামের সঙ্গে শাহ সুলতানের ১৩৪৩ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে রাজা পরশুরাম পরাজিত ও নিহত হন। সেই সময় নিজের সম্ভ্রম ও ধর্মরক্ষার জন্য পরশুরামের একমাত্র বোন শিলা দেবী করতোয়া নদীতে আত্মবিসর্জন দেন। দিনটি ছিল বৈশাখের শেষ বৃহস্পতিবার। সেই স্মৃতিকে ঘিরেই পরবর্তী সময়ে এ দিনে মহাস্থানে উভয় ধর্মের মানুষের সমাগম শুরু হয়। কালক্রমে তা রূপ নেয় সাধু-সন্ন্যাসী ও পুণ্যার্থীদের মিলনমেলায়।
প্রতি বছর এ দিন মহাস্থানগড় মাজারে পবিত্র ওরস মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইবাদত-বন্দেগির জন্য শাহ সুলতান বলখী (রহ.)-এর মাজারে অবস্থান নিলেও সাধু ও বাউলরা অবস্থান নেন পাশের হজরত বোরহান উদ্দিন (রহ.)-এর মাজার, পশ্চিম পাশের আমবাগান ও উত্তর পাশের আবাসিক এলাকার আশপাশে। এছাড়া মাজার সংলগ্ন পশ্চিম পাশের মাঠসহ পুরো মহাস্থান এলাকায় বসে মেলা। মেলায় আসা সাধু-সন্ন্যাসী ও ভক্তদের খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
বর্তমানে মেলাটি বাউল-সাধু-সন্ন্যাসীদের কেন্দ্রিক হয়ে ওঠায় সেখানে পিতলের বালা, মোটা পুঁথি, পাথরের মালা, হুক্কা, একতারা, দোতারা, বাঁশের বাঁশি, তবলা ও জুরির দোকান বেশি দেখা যায়। পাশাপাশি স্থানীয় প্রসিদ্ধ খাবার মহাস্থানের কটকটিও পাওয়া যায়, যা দর্শনার্থীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। এছাড়া মাজারের পাশে ‘দুধ পাথর’ নামে পরিচিত একটি স্থানে অনেকে মনোবাসনা পূরণের আশায় দুধ ঢালেন।
কুদরত-ই-খোদা বাবু নামে এক দর্শনার্থী বলেন, “প্রথমবারের মতো মহাস্থানগড়ের এই মেলায় এসেছি। অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল, পুন্ড্রনগরীর মতো ঐতিহাসিক স্থানটি দেখার। এখানে এসে শিকল বাবা, মাজার, জিয়ত কুণ্ড ও মোমবাতি দেখেছি। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মানুষের উপস্থিতি আর মেলার পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করেছে।”
মো. রেজাউল হক নামে অন্য একজন দর্শনার্থী জানান, প্রতি বছর বৈশাখের শেষ সপ্তাহে এখানে ‘ওরস’ পালিত হয় এবং এটি দেখার জন্যই তিনি এবার প্রথম এসেছেন। তিনি শিকল বাবা, দোয়া বাবা ও গাছের শিকড় বাবার মতো বিচিত্র সব মানুষ দেখেছেন। বগুড়ার এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্য দেশজুড়ে পরিচিতি পাওয়ায় তিনি একজন বগুড়াবাসী হিসেবে অত্যন্ত গর্ববোধ করছেন।
মো. ইয়াদ আলী নামে এক সাধক জানান, তিনি মানিকগঞ্জের গুরু আতুয়ার রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘আল-চিশতী নিজামী’ ত্বরিকার অনুসারী হয়েছেন। প্রায় ১৪ বছর আগে ঢাকার সফল ব্যবসা ও পরিবার ত্যাগ করে তিনি সত্য ও মানবতার সন্ধানে এই আধ্যাত্মিক পথে পা বাড়ান।
তিনি জানান, জাগতিক মোহমুক্ত হয়ে একাকী পথ চলেন এবং ভিক্ষাবৃত্তি এড়িয়ে সম্পূর্ণ স্রষ্টার ওপর নির্ভর করেন। গত কয়েক বছর ধরে তিনি অতি সামান্য খাবার খেয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন এবং কোনো কিছুর প্রতি তার লোভ নেই। তিনি মনে করেন, আধ্যাত্মিক উন্নতির মূল চাবিকাঠি হলো নিজের মুখ, চোখ, কান ও মনকে পবিত্র রাখা।
মহাস্থানগড় মাজার মসজিদ কমিটির সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তা এএইচএম রবিউল করিম বলেন, “প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার হযরত শাহ সুলতান বলখী (রহ.)-এর মাজার শরীফে ওরস অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে মসজিদ প্রাঙ্গণে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া মাহফিল, জিকির এবং গভীর রাত পর্যন্ত ইসলামী বয়ানের আয়োজন করা হয়। মহাস্থানগড় কেবল মুসলিমদের নয়, বরং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষের কাছে একটি পবিত্র ও পুণ্যময় স্থান। সর্বধর্মের মানুষের এই পদচারণার কারণেই স্থানটির নাম হয়েছে ‘মহাস্থান’। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত, অনুরাগী ও পর্যটকরা এখানে ভিড় করেন। মেলার নিরাপত্তা ও সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।