তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার পর, ইরানের বিরুদ্ধে আবারো কঠোর ও সহিংস হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর আল-জাজিরার।
রবিবার (১৭ মে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করার আগের সময়টুকু ফুরিয়ে আসছে।
সংক্ষিপ্ত, দুই লাইনের সেই বার্তায় ট্রাম্প লেখেন, “ইরানের জন্য ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে চলছে। তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, খুব দ্রুত, অন্যথায় তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সময় খুব মূল্যবান!”
এর মাত্র একদিন আগেই, ট্রাম্প এআই দিয়ে তৈরি একটি যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে নিজের একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন, যার ক্যাপশন ছিল- “এটি ছিল ঝড়ের আগের শান্তাবস্থা।”
বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্য অর্জনে মার্কিন প্রশাসন যখন কূটনৈতিক টেবিলে হিমশিম খাচ্ছে, তখন প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতেই ট্রাম্প এই ধরনের আক্রমণাত্মক কৌশল বেছে নিয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে এই সংঘাতের সূচনা হয়, যাকে ইরানি কর্মকর্তারা ‘চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্প এই যুদ্ধের জন্য বেশ কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করা, আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং তাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করা।
গত ৭ এপ্রিল, ট্রাম্প সেই দাবিগুলোর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট যোগ করেছিলেন, যা ইরানের সম্পূর্ণ ধ্বংসের ইঙ্গিত দেয়। সমালোচকরা ওই পোস্টটিকে গণহত্যার আহ্বানের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
ট্রাম্প লিখেছিলেন, “আজ রাতে একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না। আমি চাই না এমনটা হোক, তবে সম্ভবত এটাই ঘটবে।”
ওই পোস্টের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় যা তখন থেকেই কার্যকর রয়েছে, যদিও উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এর আগেও ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো, যার মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সেতু রয়েছে, সেগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন হতে পারে।
গত মে মাসে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানি কর্মকর্তারা যদি মার্কিন জাহাজে হামলা চালায় তাহলে তাদের ‘পৃথিবীর বুক থেকে উড়িয়ে দেওয়া হবে’।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ধরনের হুঁশিয়ারিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে আসছে তেহরান। দেশটির সংবাদ সংস্থা ‘মেহের’ জানিয়েছে, ওয়াশিংটন তাদের প্রস্তাবে কোনো ধরনের বাস্তবসম্মত ছাড় দেয়নি। উল্টো, তারা যুদ্ধের মাঠে যা অর্জন করতে পারেনি, তা আলোচনার টেবিলে কূটনীতির মাধ্যমে আদায় করতে চাইছে- যা কখনোই সফল হবে না।
রবিবার (১৭ মে) ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “আমেরিকার যে অপমান হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে যেকোনো ধরনের বোকামির পুনরাবৃত্তি করলে আরো বেশি বিধ্বংসী ও মারাত্মক আঘাত পাওয়া ছাড়া তারা আর কিছুই পাবে না।”
আল-জাজিরার তেহরান সংবাদদাতাদের মতে, “ইরান সরকারের মনোভাব এখন নমনীয় হওয়ার চেয়ে স্পষ্ট প্রতিরোধের। কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। উভয় পক্ষই এখন ‘ট্রিগারে আঙুল দিয়ে’ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।”
তবে পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক অ্যাডাম ক্লিমেন্টস মনে করেন, ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পেছনে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ধরনের চটকদার বা আক্রমণাত্মক কথা বলে নিজের দেশের ভোটারদের নজর কাড়তে পছন্দ করেন।”
আল-জাজিরাকে ক্লিমেন্টস আরো বলেন, “আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্পের এই বক্তব্যগুলো তার কর্মকর্তাদের মুখেও শোনা যায় কিনা এবং এর সঙ্গে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায় কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে।”