আন্তর্জাতিক

ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে ‘বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে ‘আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

সংস্থাটি জানিয়েছে, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে এ পর্যন্ত প্রায় ২৪৬ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি এখনই ‘মহামারি’ রূপ ধারণ না করলেও, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। খবর বিবিসির।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ইবোলার বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি মূলত ‘বুন্দিবুগিও’ নামক একটি বিরল প্রজাতির ভাইরাসের কারণে হচ্ছে। সাধারণত ইবোলার ‘জায়রে’ প্রজাতির ভ্যাকসিন থাকলেও, বুন্দিবুগিও প্রজাতির জন্য অনুমোদিত কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন নেই। ফলে রোগটি স্থানীয় ও আঞ্চলিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ইবোলার প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে রোগীর জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, ক্লান্তি এবং গলা ব্যথা দেখা দেয়। পরবর্তী ধাপে বমি, ডায়রিয়া, ত্বকে ফুসকুড়ি এবং অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক রক্তক্ষরণ শুরু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ইবোলায় আক্রান্তদের গড় মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ।

ইবোলা ইতিমধ্যে কঙ্গোর সীমান্ত ছাড়িয়ে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায় প্রবেশ করেছে। সেখানে দুজনের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৯ বছর বয়সী এক কঙ্গোলিজ নাগরিক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এছাড়া কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান শহর গোমা-তেও একজন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা বর্তমানে ‘এম২৩’ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বিবিসি মার্কিন সহযোগী সিবিএস নিউজের সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ডিআর কঙ্গোতে অন্তত ছয়জন মার্কিন নাগরিক ইবোলার সংস্পর্শে এসেছেন। তাদের মধ্যে একজনের শরীরে উপসর্গ দেখা দিলেও, এখন পর্যন্ত কারো সংক্রমণ নিশ্চিত হয়নি। মার্কিন সরকার তাদের জার্মানির একটি সামরিক ঘাঁটিতে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মহাপরিচালক ডা. জ্যাঁ কাসেয়া ভাইরাস মোকাবিলায় জনসাধারণকে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে মরদেহের শেষকৃত্য করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, “সামাজিক শেষকৃত্যের সময় প্রিয়জনের মরদেহ ধোয়ার প্রথা থেকে অতীতে বহু মানুষ সংক্রমিত হয়েছিল। আমরা চাই না শেষকৃত্যের আচার পালন করতে গিয়ে মানুষ আবার আক্রান্ত হোক।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ডিআর কঙ্গোতে চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মানবিক সংকট, এর সঙ্গে জনসংখ্যার উচ্চ চলাচল, হটস্পটটির শহুরে অবস্থান এবং এই অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক অনানুষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

রুয়ান্ডা বলেছে, ‘সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে তারা ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে তাদের সীমান্তে স্ক্রিনিং আরো কঠোর করবে।

দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য দলগুলো ‘প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনে দ্রুত পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে’ সতর্ক রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আক্রান্ত অঞ্চলের বাইরের দেশগুলোর উচিত নয় তাদের সীমান্ত বন্ধ করা বা ভ্রমণ ও বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করা, কারণ ‘এই ধরনের পদক্ষেপগুলো সাধারণত ভয়ের কারণে নেওয়া হয় এবং এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই’।

সংস্থাটি ডিআর কঙ্গো ও উগান্ডাকে সংক্রমণ-প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ, শনাক্তকরণ ও বাস্তবায়নের জন্য জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্র স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে।

সংক্রমণ কমাতে সংস্থাটি বলেছে, শনাক্ত হওয়া রোগীদের দ্রুত আইসোলেশন করে চিকিৎসা দিতে হবে। আক্রান্ত রোগীর পরপর দুটি টেস্ট (৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে) নেগেটিভ না আসা পর্যন্ত আইসোলেশনে রাখতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ডা. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমানে সংক্রমিত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা এবং এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি নিয়ে ‘উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা’ রয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালে কঙ্গোতেই প্রথম ইবোলা ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়, যা মূলত বাদুড় থেকে ছড়ায়। এটি কঙ্গোতে ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব। এর আগে ২০১৮-২০২০ সালের প্রাদুর্ভাবে দেশটিতে রেকর্ড ২ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।