বড় বাজেট নিয়ে সমালোচনার জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “উচ্চাভিলাষ না থাকলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি হবে না, কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে না। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠনে বড় বিনিয়োগের বিকল্প নেই।”
সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন মিলনায়তনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মোট আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এটি বড় আকারের উন্নয়ন কর্মসূচি।
আমির খসরু বলেন, “ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠনের একটি সুস্পষ্ট কৌশল প্রয়োজন। সে লক্ষ্যেই সরকার ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ তৈরি করেছে।”
তিনি বলেন, “এডিপি শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা নয়; এটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, টেকসই অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত রূপরেখা।”
কৌশলগত পরিকল্পনার প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, “বিচার ও আইনগত সেবা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”
প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, “অতীতে অযোগ্য ব্যক্তিকে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কারণে অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ হয়নি। এখন থেকে পিডি নিয়োগে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।”
অর্থমন্ত্রী বলেন, “প্রতিটি প্রকল্প নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে আলাদা ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোথাও ধীরগতি বা অনিয়ম দেখা গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চলমান প্রকল্প পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প চলমান ছিল, যার অনেকগুলোই অগ্রাধিকারবিহীন। যেসব প্রকল্প জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় নয় বা বাস্তবায়নযোগ্য নয়, সেগুলো বাদ দেওয়া হবে। তবে, যেসব প্রকল্প শেষ হলে জনগণ উপকৃত হবে, সেগুলো সম্পন্ন করা হবে।”
কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সরকার ‘জবলেস গ্রোথ’ চায় না। বিনিয়োগের বিপরীতে কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং অর্থনীতিতে কী অবদান রাখবে, তা বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্প নেওয়া হবে।”
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বড় বরাদ্দের বিষয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষায় বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কারের কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, “নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করে কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন— পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের সদস্য (সচিব) এস এম শাকিল আখতার।