খুররাম শেহজাদের শর্ট বল এক পা উঠিয়ে পুল করে যেভাবে বাউন্ডারিতে পাঠালেন তাইজুল ইসলাম তা মুগ্ধ হয়ে দেখেছে সবাই। ওই বলের আগে তাইজুলের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছিল সৌদ শাকিলের। আরেকদিকে মুশফিকুর রহিম ও শান মাসুদেরও লেগে গিয়েছিল। দুই দিক সামলে পরের বলটা ছিল চ্যালেঞ্জিং। লেজের ব্যাটসম্যান হওয়ায় তাইজুলের ওপর ছিল চাপ। কিন্তু যেভাবে তাইজুল শট খেলে বল বাউন্ডারিতে পাঠিয়েছেন তাতে প্রধান নির্বাচকও বলতে বাধ্য হন, ‘‘ব্রায়ান চার্লস তাইজুল।’’
স্পিন বোলিং তাইজুলের মূল কাজ। নিজের কাজটা ঠিকঠাক করেই তাইজুল সাদা পোশাকের ক্রিকেটে ২৫৭ উইকেট নিয়েছেন। তবে ব্যাটিংটাও যে এখন আধুনিক ক্রিকেটে অতি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে তা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছেন তাইজুল ইসলাম। শুধু তিনিই নন, লোয়ার অর্ডারে ব্যাটিং করা তাসকিন, শরিফুল, নাহিদ কিংবা একাদশের বাইরে থাকা হাসান ও খালেদরাও বুঝতে পারছেন শেষ দিকে সামান্যতম অবদানও বড় হয়ে উঠতে পারে। ঠিক কতোটা সেটা সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসের দিকে চোখ দিলে বোঝা যাবে। বাংলাদেশের রান যখন ৬ উইকেটে ১১৬ তখন ক্রিজে যান তাইজুল। উইকেটে আগে থেকে ছিলেন লিটন। প্রতিষ্ঠিত আর কোনো ব্যাটসম্যান নেই। সেখান থেকে লিটন সেঞ্চুরি করে বাংলাদেশের রান নিয়ে যান ২৭৮ এ।
ব্যাটসম্যান হিসেবে নিঃসঙ্গ শেরপা লিটন। বাকিরা হচ্ছেন তাইজুল, তাসকিন ও শরিফুল। যারা লিটনকে শুধু সাহসই দেননি বরং উইকেট আগলে রেখে দিয়েছেন যুদ্ধের প্রেরণা, লড়াইয়ের জেদ। তাইজুলের সঙ্গে সপ্তম উইকেটে লিটনের জুটি ৬০ রানের। দুজন মিলে বল খেলেছেন ১১৪টি। অষ্টম উইকেটে তাসকিন ও লিটন ৪২ বলে যোগ করেন ৩৮ রান। নবম উইকেটে শরিফুল ও লিটনের শেষ জুটি ৬৪ রানের। যা হয়েছে ৭৩ বলে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে বড় জুটিটাই এসেছে নবম উইকেটে।
দ্বিতীয় ইনিংসে লিটনের জায়গায় এসেছেন মুশফিকুর। তাইজুল মুশফিকুরকে সেঞ্চুরি পেতে করেছেন সহায়তা। ১২৮ বলে ৭৭ রানের জুটি গড়েন তারা। এরপর মুশফিকুর ও তাসকিন ১৫ এবং মুশফিকুর ও শরিফুল ১৯ রানের জুটি গড়েন। তাইজুল ৫১ বলে ২২ রান করে আউট হয়ে হতাশায় পুড়ছিলেন। এমন উইকেটে আরো ভালো করার ইচ্ছে ছিল তার, ‘‘আমরা যদি স্কোরবোর্ডে আরো ২০-৩০-৪০ রান যোগ করতে পারতাম, দলের জন্য ভালো হতো। এর থেকে হতাশার কিছু নেই। সবকিছু ১০০% হবে এমন না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এরকম হইতেই পারে। তারপরও আমার কাছে মনে হয় জায়গাটা আরো উন্নতি করার সুযোগ আছে।’’
লোয়ার অর্ডারের বর্তমান ব্যাটিং নিয়ে তাইজুল বলেছেন, ‘‘আপনি দেখবেন হয়তোবা কিছু কিছু জায়গায় ল্যাকিং ছিল (লোয়ার অর্ডার ব্যাটিং)। বিগতদিন হয়তোবা টেলের কাছ থেকে রান আসে নাই। হয়তোবা সেজন্য এরকম প্রশ্নটা। কিন্তু এখন আপনি দেখবেন যে অনেকেই এটা নিয়ে অনেক সিরিয়াস। কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে খেলোয়াড়রাও এদিকে খুব আগ্রহী যে আমরা যাতে কিছুটা অবদান রাখতে পারি। একটা খেলোয়াড়ের জন্যই লাভ যে আমি বোলিংয়ের পাশাপাশি যখন ২০-৩০ রান করতে পারবো এটা অবশ্যই একটা বিরাট কিছু।’’
ক্রিজে মুশফিকুর রহিম থাকায় কাজটা সহজ হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করেন তাইজুল, ‘‘অবশ্যই এটা আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক দিক। আপনি যখন একটা সিনিয়র খেলোয়াড়ের সাথে ড্রেসিংরুম শেয়ার করবেন, তার অভিজ্ঞতা বলেন বা সে যখন রান করে উইকেটে থাকে, তার সাথে আরেকজন যে থাকে তারও খেলাটা সহজ হয়। যখন আমি ব্যাটিং করছিলাম, হয়তো আমাকে অনেক তথ্য দিচ্ছিল। তো হয় কি, এই কারণে দেখা যাচ্ছে আপনি ব্যাটিং করবেন ৫০% আর ৩০-৪০% আপনার জন্য কাজটা সহজ হয়ে যায়। অভিজ্ঞ কারো সাথে ব্যাটিং করাটা, অনেক কিছু বুঝতে পারাটা সহজ করে দেয়।’’
৫৯ টেস্টে ৯৯ ইনিংসে তাইজুল ৯০৩ রান করেছেন। সর্বোচ্চ রান ৪৭। ১১ ইনিংসে ছিলেন নটআউট। নিজেকে অলরাউন্ডার হিসেবে ভাবেন না তাইজুল। তবে সাহস নিয়ে ব্যাটিং করার কথা বললেন তিনি, ‘‘না, আমি যেটুকুই ব্যাটিং পারি বা করি, আমার স্কিল কতখানি ভালো আমি জানি না। কিন্তু আমার মনের মধ্যে একটা সাহস কাজ করে যে আমি পারবো। আমার সাথে যদি ব্যাটসম্যান থাকে, আমি চেষ্টা করি তাকে কতটুকু পার্টনারশিপ দিয়ে স্কোরটা বাড়ানো যায়। আমি যতক্ষণ স্কোর করতে পারবো, দলের জন্য লাভ হবে। অনেকদিন ধরে খেলছি। এই সময় এসে যদি ২০-৩০-৪০ রান দলকে না দিতে পারি, এটা আরেকটা বড় ব্যর্থতা।’’