রাইজিংবিডি স্পেশাল

ডিসি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গতি, অগ্রগতি রিপোর্ট দিতে হবে প্রতি ১৫ দিনে

জেলা প্রশাসক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা ৩০টির বেশি প্রস্তাবনা আর ফাইলবন্দি থাকছে না। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিবদের কাছে দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনা পাঠাবে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই পরিপত্র জারি করে কাজের অগ্রগতি ১৫ দিন পরপর জানাতে বলা হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, এবারের সম্মেলনের সিদ্ধান্ত ফাইলবন্দি থাকবে না। প্রতি ১৫ দিন অন্তর অগ্রগতি রিপোর্ট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখায় জবাবদিহি বাড়বে। মাঠ থেকে উঠে আসা সমস্যা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নীতিতে রূপ নিচ্ছে, এমনটাই দেখা যাচ্ছে।

ওসমানী মিলনায়তনে দুই ঘণ্টার মুক্ত আলোচনা

গত ৩ থেকে ৬ মে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনের প্রথম দিনে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় বসেন ৬৪ জেলার ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনাররা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের উপস্থিতিতে আলোচনা চলে প্রায় দুই ঘণ্টা।

আলোচনার শুরুতেই ডিসিরা মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। ভূমি ব্যবস্থাপনার জটিলতা, মাদক ও জঙ্গিবাদ দমন, খাদ্য নিরাপত্তা, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা, চা-শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়। অনেক জেলার প্রশাসক সরাসরি বলেন, কাগজের হিসাব আর মাঠের বাস্তবতা মিলছে না। দ্রুত সিদ্ধান্ত চাই।

চট্টগ্রামে খাল খননের সময় প্রাপ্ত মাটি যথাযথ ব্যবহার করে অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনার প্রস্তাব দেন চট্টগ্রামের ডিসি। তিনি বলেন, “একদিকে নগরের জলাবদ্ধতা কমবে, অন্যদিকে কৃষিজমি বাড়বে।” একইসঙ্গে কক্সবাজারসহ সব জেলায় ভূমি অফিস অটোমেশন করে ক্ষতিপূরণের অর্থ আইবাস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

উপকূলীয় অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির লবণাক্ততা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তাব আসে খুলনা ও বরিশালের প্রশাসকদের কাছ থেকে। তারা বলেন, লবণাক্ততা বাড়ায় কৃষি ও সুপেয় পানি দুটোই হুমকিতে।

তিন পার্বত্য জেলার ডিসিরা ভূমি জরিপ আধুনিকায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি তোলেন। হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাটে চা-শ্রমিকদের জন্য ৫০ শয্যার দুটি হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব দেন হবিগঞ্জের ডিসি। ভোলার ডিসি বলেন, “জেলায় ৫০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল না থাকায় রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হয়।”

যোগাযোগ খাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক আট লেনে উন্নীতকরণ, গাজীপুর-ঢাকা মহাসড়কের অসম্পূর্ণ কাজ দ্রুত শেষ করার প্রস্তাব আসে। বগুড়া বিমানবন্দরে কার্গো বিমান ওঠানামার উপযোগী অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের কথাও বলেন রাজশাহীর ডিসি।

সামাজিক সমস্যা নিয়েও কথা হয়। অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে আইন সংশোধন করে মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলভুক্ত করা, মাদক মামলায় তিনবার সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে জামিন অযোগ্য করার প্রস্তাব দেন কয়েকজন ডিসি। হাওর এলাকায় ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালু, টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে ডাকাতিয়া বিলসহ ২৭টি বিলের জলাবদ্ধতা নিরসনের কথাও ওঠে।

প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা

পরিবেশ, রেল আর খাস জমির প্রস্তাবনা শুনে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি বিষয়ে তাৎক্ষণিক দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, “উন্নয়ন কাজে খরচ কমাতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। ইটভাটায় মাটির ব্যবহার পরিবেশ দূষণ বাড়ায়। তাই সিমেন্ট ব্রিক ও হোলো ব্রিকের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে হবে।” ই-টেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে দরপত্র প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার নির্দেশও দেন।

নতুন সড়ক বা অতিরিক্ত লেন নির্মাণের বদলে রেল যোগাযোগ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। বলেন, রেল সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। বনায়ন ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকারি খাস জমি ব্যবহারের নির্দেশ দেন। ব্যক্তি উদ্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহীদের ১৫ বছরের জন্য খাস জমি বন্দোবস্তের প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে বলা হয়েছে।

সরকারি টেন্ডারে নির্দিষ্ট হারে সিমেন্ট ব্রিক ও হোলো ব্রিক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, বাজারে চাহিদা তৈরি হলে বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে।

ইটভাটায় কড়াকড়ি, খেলাধুলা ও ঐতিহ্যে জোর

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা থাকছে, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুন ইটভাটার অনুমোদন আপাতত বন্ধ রাখতে হবে। একইসঙ্গে শিশু-তরুণদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ম্যালেরিয়া ও সাপে কাটা রোগীদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন, চা-শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পৃথক হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদনের পথে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

সীমান্তে নজর, জলপথ-রেলপথে সংযোগ মাদক ও চোরাচালান রোধে মৌলিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার সদস্যদের বিজিবির সহযোগী সদস্য হিসেবে সীমান্ত এলাকায় নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ভারতের আসাম এবং নেপাল-ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়াতে চিলমারী রেলস্টেশন থেকে নদীবন্দর পর্যন্ত ৫০ মিটার রেললাইন সম্প্রসারণের প্রস্তাবও পর্যালোচনায় রয়েছে।

জবাবদিহিতা ও পুরস্কার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় থাকছে, খাল খনন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো অগ্রাধিকার খাতের কাজ নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। বাস্তবায়নের অগ্রগতি যাচাই করে প্রতি ১৫ দিন অন্তর প্রতিবেদন পাঠাতে হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে। প্রতিবেদনে কী কাজ হয়েছে, কী বাধা আছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রথমে জেলাভিত্তিক ও পরে জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে বলে মনে করছে মন্ত্রিপরিষদ। পুরস্কারের মাপকাঠি হবে জনসেবা, উদ্ভাবন ও দ্রুত সমস্যা সমাধান

বিশ্লেষকরা বলছেন, জেলা প্রশাসক সম্মেলনের প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের এই উদ্যোগ সরকারের মাঠ-কেন্দ্রিক নীতির স্পষ্ট প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসকরা যে সমস্যাগুলো তুলে আসছিলেন, সেগুলো এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নীতিতে রূপ নিচ্ছে।

একজন সাবেক সচিব বলেন, ডিসি সম্মেলন প্রতিবছর হয়, কিন্তু এবার ফলোআপ মেকানিজম রাখা হয়েছে। ১৫ দিন পরপর রিপোর্ট মানে কাজ না করলে ধরা পড়বে। এটা প্রশাসনে নতুন সংস্কৃতি তৈরি করবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্দেশনা বাস্তবায়নে গড়িমসি হলে সংশ্লিষ্ট সচিবদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। ফলে এবার সম্মেলনের সিদ্ধান্ত কাগজে আটকে থাকবে না। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও বলছেন, দীর্ঘদিন পর তাদের কথা শোনা হলো এবং কাজের দিকনির্দেশনা পাওয়া গেল।

তবে বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জও আছে। অর্থ ছাড়, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, মাঠ পর্যায়ের জনবল ঘাটতি বড় বাধা হতে পারে। এজন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি মনিটরিং সেল গঠন করছে বলে জানা গেছে। সেল সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রিপোর্ট করবে।

ঢাকা বিভাগের এক জেলা প্রশাসক  (ডিসি) বলেন, “নির্দেশনা পাওয়ার পর থেকে কাজ শুরু করা হবে।  অনেক জেলায় খাল খনন ও খাস জমি বন্দোবস্তের কাজ দ্রুত শুরু হবে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এবারের সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনবে।