রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যেকার ‘গভীর’ সম্পর্ককে বিশ্বমঞ্চে একটি ‘স্থিতিশীল’ শক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের উদ্দেশ্যে বেইজিং পৌঁছানোর আগে এক ভাষণে তিনি এই মন্তব্য করেন। খবর আল-জাজিরার।
মঙ্গলবার (১৯ মে) থেকে শুরু হওয়া দুই দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরের প্রাক্কালে পুতিন বলেন, মস্কো ও বেইজিং অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে জোট গঠন করতে চায় না। বরং তারা ‘শান্তি ও সর্বজনীন সমৃদ্ধির’ লক্ষ্য নিয়ে একসঙ্গে কাজ করছে।
ইউক্রেন আগ্রাসনের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত পুতিন তার ভাষণে বলেন, “এই বিশেষ মনোভাব নিয়েই মস্কো ও বেইজিং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদের নীতিগুলোকে সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করার জন্য যৌথ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরো যোগ করেন, জাতিসংঘ, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিকস-এর মতো বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
রুশ প্রেসিডেন্টের মতে, মস্কো-বেইজিং সম্পর্ক বর্তমানে একটি ‘নজিরবিহীন স্তরে’ পৌঁছেছে। রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতের পাশাপাশি দুই দেশ এখন ‘সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় ঐক্য’-এর মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে একে অপরকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছে।
বুধবার (২০ মে) শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুতিনের চীনে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এই দুই নেতার দ্বিতীয় সরাসরি বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে রাশিয়া ও চীনকে ক্রমবর্ধমানভাবে একতাবদ্ধ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুতিনের এই সফরটি দুই দেশের ‘সৎ-প্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’র ২৫তম বার্ষিকী উদযাপনের সঙ্গে মিলিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি এমন এক সময়ে ঘটছে যার মাত্র কয়েক দিন আগেই শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে দুই দিনের একটি সম্মেলন শেষ করেছেন।
ট্রাম্প ও শির বৈঠকে উষ্ণ বাক্যবিনিময় ও জাঁকজমক দেখা গেলেও বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান এবং ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের মতো দুই পক্ষের মধ্যকার বহু বিতর্কিত বিষয়ে খুব কমই সুনির্দিষ্ট চুক্তি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউএনএসডব্লিউ-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সিনিয়র লেকচারার আলেকজান্ডার করোলেভ বলেন, পুতিন ও শি এমন একটি সময়ে তাদের অংশীদারিত্ব জোরদার করতে এই সম্মেলনকে ব্যবহার করছেন যখন উভয় দেশই কৌশলগত চাপের মুখোমুখি।
করোলেভ আল-জাজিরাকে বলেন, “রাশিয়ার জন্য এই সফরটি প্রমাণ করে যে, পশ্চিমা চাপ সত্ত্বেও তারা উচ্চ-পর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক অংশীদার বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, চীনের জন্য এটি পুনর্নিশ্চিত করে যে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তাদের কৌশলগত পরিবেশের একটি নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ হিসেবে বজায় রয়েছে।”
করোলেভ আরো যোগ করেন, “এই সফরটি বেইজিংয়ের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা এবং এই সত্যটিকেও তুলে ধরে যে, চীনের পররাষ্ট্রনীতি নিজস্ব গতিতে চলে এবং এটি অন্য কারো পছন্দ-অপছন্দ দ্বারা পরিচালিত হয় না।”
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলো ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মস্কোর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করে বেইজিং।
মার্কেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রাশিয়া ও চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে ২৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
চীনে রাশিয়ার রপ্তানির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তেল, গ্যাস এবং কয়লা- যা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে মস্কোর জন্য একটি অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে চীন রাশিয়াকে যন্ত্রপাতি, যানবাহন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন ধরনের উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করে থাকে।