রাইজিংবিডি স্পেশাল

নোনা মাটিতে ফিরছে সবুজ, সংকট কাটেনি

আকাশে মেঘের ঘনঘটা, প্রবল বাতাসের তোড়, নদীতে ঢেউ, তীরে নাজুক বেড়িবাঁধ—এই দৃশ্যপট বিপন্ন এলাকার মানুষদের আতঙ্কিত করে। কখন আসে ঝড়, কখন ভাসিয়ে নেয় বাড়িঘর, সম্পদ! প্রাকৃতিক বিপদে বারবার ক্ষতির মুখে পড়া মানুষেরা দুর্যোগ মৌসুমে ভয়ে থাকেন। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ৬ বছর পরেও প্রবল ভয় নিয়ে দিন অতিবাহিত করছেন ফারুক হোসেন, রফিকুল ইসলাম, নূর ইসলাম, তাহমিনা বেগম, মকবুল গাজী, খাদিজা খাতুনের মত আরো অনেকে। এদের বাড়ি দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে। সুপার সাইক্লোন আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সংকটে থাকা বাংলাদেশের বহু মানুষের মধ্যে এখানে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। এখন অবধি বহু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।  

খুলনার কয়রা, পাইকগাছা, সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার মানুষদেরও অনেক সংকটের মধ্যে দিন অতিবাহিত করতে হয়েছে। বহু মানুষ শহরে চলে গেছে, অনেকে পেশা বদল করেছেন। অনেক কৃষক ফিরতে পারেনি পুরানো কাজে। তারপরও বহুমুখী সংকটের মাঝেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। নোনা মাটিতে, পোড়া পরিবেশে তারা সবুজ ফিরিয়ে আনছে। ২০২০ সালের ২০ মে এই ঘূর্ণিঝড় আম্ফান একইসঙ্গে বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আঘাত করেছিল। বাংলাদেশে সাইক্লোনে ক্ষতি হয়েছিল ১৬,০৮,৩৫,৬৪,৩০০ টাকা এবং মৃত্যু হয়েছিল ২৬ জনের। সাইক্লোন বহু মানুষকে নিঃস্ব করেছে। বহু মানুষকে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালে সুপার সাইক্লোন আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল। 

প্রাক-মনসুনে সাইক্লোনের ভয় মে মাসে। ক্রমাগত হিটওয়েভের কারণে এই ভয় আরো বাড়ছে। বাংলাদেশে ২০২৩-২০২৪ টানা দুইবছর ধরে প্রাক-মনসুন হিটওয়েভ অব্যাহত আছে। ২০২৪ সালে দেশে ৭৬ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। তীব্র গরম সাইক্লোনের ভয় বাড়াচ্ছে। এবছর চলতি মে মাসের শেষ সপ্তাহে আরো একটি সাইক্লোনের পুর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অতীতে মে মাসে ইতিমধ্যে ১২টি সাইক্লোনের রেকর্ড রয়েছে; যা বাংলাদেশ ও ভারতে আঘাত করেছিল। এগুলো হলো- ২০০৮ সালের ২ মে, ২০১৯ সালের ৩ মে (ফণী), ১৯৬১ সালের ৫ মে, ১৯৬৫ সালের ৯ মে, ২০১৩ সালের ১৬ মে (মহাসেন), ২০২১ সালের ১৭ মে (ত্বাকতে), ২০২০ সালের ২০ মে (আম্ফান), ২০১৬ সালের ২১ মে (রোয়ানু), ১৯৮৫ সালের ২৪ মে, ২০০৯ সালের ২৫ মে (আইলা), ২০২১ সালের ২৬ মে (ইয়াস) এবং ২০১৭ সালের ৩০ মে (মোরা)। 

সাইক্লোন আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কর্মরত নন-গভার্নমেন্ট অর্গানাইজেশন উত্তরণ-এর হেড অব প্রোগ্রাম (ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ওয়াটার গাভার্নেন্স) জাহিদ অমি শাশ্বত বলেন, ‘‘আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করছে। সরকার এবং এনজিওগুলির উন্নয়ন প্রচেষ্টা রয়েছে। তবে রূপান্তরমূলক পরিবর্তন আনতে বড় আকারের কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি।’’

যেখানে ছিল সড়ক পথ, সেখানে কাঠের সাঁকো

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-সিপিআরডি’র প্রধান নির্বাহী মো. সামসুদ্দোহা বলেন, ‘‘কোভিড ১৯-এর মত মহামারী চলাকালে আঘাত করেছিল আম্ফান। ফলে সাইক্লোন মোকাবিলাও ছিল চ্যালেঞ্জের। সাইক্লোনসহ প্রাকৃতিক বিপদগুলো মোকাবিলায় আমাদের সুশাসনের দিকে নজর দিতে হবে। পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় এবং অবকাঠামো নির্মাণে সুশাসন নিশ্চিত না হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সংকট আরো বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্তদের ঘুরে দাঁড়াতে সকলে মিলে সহায়তা করতে হবে।’’

নোনা মাটিতে সবুজ 

লবণের তীব্রতায় গাছপালা মরে গিয়েছিল। কৃষিজমি, বাড়িঘর, সবখানে সাদা লবণের আস্তরণ চোখে পড়ত। যেখানে খাল ছিল না, সেখানেও খাল তৈরি হয়েছিল জোয়ারের প্রবল তোড়ে। সড়ক ভেঙে খাল হয়ে গিয়েছিল। মানুষজনের চলাচল হতো সড়ক পথের বদলে নৌকায়। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের পর এক বছরের বেশি সময় ধরে লোনা পানিতে ডুবেছিল অনেক এলাকা। কয়রা উপজেলার অনেক এলাকা ছিল লবণ পানির তলায়। বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণ পানি ঢুকেছিল এবং জোয়ারের পানিতে প্রতিদিন ভাসত বহু এলাকা। বহু মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল বেড়িবাঁধে। একই চিত্র চোখে পড়ে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর এলাকায়। কুড়িকাহুনিয়া, শ্রীপুর, কল্যাণপুর, তালতলা, বন্যতলা, হরিশখালী, ফুলতলাসহ আরো অনেক গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে মানুষ চরম দুর্দশার মধ্যে বসবাস করেছে। কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাটের নিকটে এবং হরিষখালী এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে। গোটা এলাকা দিনে দু’বার ভাসত লবণ পানিতে। বহু মানুষ স্কুলে, সাইক্লোন শেলটারে, বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে লবণ পানিতে ডুবে থাকায় গোটা এলাকা গাছপালা শূন্য হয়ে পড়ে। ফসলি মাঠ লবণে পুড়ে ছাড়খার হয়। কিন্তু এলাকার মানুষেরা বিভিন্ন উপায়ে সবুজ ফিরিয়ে এনেছে। 

প্রতাপনগর গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, ‘‘আমার বাড়িটি ছিল ঘর গাছপালায় ঘেরা। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার আগে বাড়িতে বিভিন্ন জাতের অনেক গাছ লাগিয়েছিলাম। ৬০টি আম গাছে ফলন এসেছিল। ১৪টি নারিকেল গাছ ছিল। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে আসা লবণ পানিতে সব মরে গেছে। এখন আবার চেষ্টা করছি বাড়িতে সবুজ ফেরানোর। ইতোমধ্যে অনেক জাতের গাছ লাগিয়েছি। বিভিন্ন উপায়ে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু এ লড়াই বড় কঠিন।’’

লুৎফর রহমানের পাশে বসা ছিলেন ওজিয়ার রহমান। তিনি বলেন, ‘‘আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি, কবে বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণ পানি ঢুকে সব নষ্ট হয়ে যায়। এই জীবনে অনেক বার ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হয়েছি। আম্ফানে সব হারিয়েছি। গাছপালা কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা বেড়েছে। আমাদের বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মাটি এখন আর আগের মত নাই। গাছপালা লাগানো বা অন্যান্য ফসল ফলানো খুব কঠিন। তবুও আমরা চেষ্টা করছি। অনেক এলাকায় এখন সবুজ ফিরে এসেছে। তবে শক্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হলে বারবার আমরা ক্ষতির মুখে পড়ব।’’

এলাকা ঘুরে দেখা যায়, লবণাক্ততা প্রতিরোধের জন্য কিছু মানুষ মাটির ঢিবি তৈরি করে গাছের চারা রোপণ করছে। আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলের গাছ লাগাচ্ছেন তারা। গাছগুলো এখন বেশ বড় হয়েছে। আম্ফানের ৬ বছরে এলাকার চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে। সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর মানুষগুলো আবার শূন্য থেকে শুরু করেছে। প্রতিনিয়ত টিকে থাকার লড়াই করছে। 

কৃষকদের লড়াই কঠিন হয়েছে

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কৃষকদের লড়াই আরো কঠিন হয়েছে। অবস্থাপন্ন কৃষক, ক্ষুদ্র অথবা মাঝারি কৃষক, যারা জমিতে ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন, সংসারের চাকা ঘুরাতেন, তারা সকলেই এখন লড়াই করে টিকে আছেন। প্রতাপনগর ঘুরে দেখা যায়, সেখানে প্রায় এক বছরের বেশি সময় পড়ে জোয়ার-ভাটা বন্ধ করা গেছে। কিন্তু বেড়িবাঁধে কোন স্লুইজগেট নেই। ফলে বর্ষায় এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। কৃষকের ধান আবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে। জলাবদ্ধতার আগে যারা অতিকষ্টে ধান আবাদ করেন, তা ক্ষেতেই পচে যায়। শুকনোয় ধান বা অন্যান্য ফসল ফলানোর জন্য সেচের পানি পাওয়া যায় না। তখন জমির কড়কড়ে মাটির দিকে তাকিয়ে ছাড়া কৃষকের কিছুই করার থাকে না।  

ধান ক্ষেত পুড়ে গেছে লবণে

কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের আবদুস সাত্তার গাজীর অসমাপ্ত পাকা ভবনটি অল্পের জন্য আম্ফানের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। বাড়ির সামনে, যেখানে তাদের পরিবারের ৪-৫ শ’ বিঘা জমি ছিল, তার অধিকাংশই এখন খালের মধ্যে। সাত্তার যেখানে জমি আবাদ করতেন, সেখানেই তিনি এখন নৌকা চালান। বাড়ির সামনে ১২০ ফুট চওড়া খাল ছিল। কিন্তু বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের প্রবল স্রোতে খালটি ৩০০ ফুট চওড়া হয়ে গেছে। এখানে ওয়াজেদ আলী গাজী, মাফুয়ার রহমানসহ আরো অনেক কৃষকের জমি গিলে খেয়েছে আম্ফান। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, গোয়াইলকাঠি মৌজায় ৫০০ বিঘা জমিতে ১৫০ কৃষক, সনাতনকাঠি মৌজায় ৪০০ বিঘা জমিতে ১০০ কৃষক, কুড়িকাহুনিয়া মৌজায় ১২০০ বিঘা জমিতে ৭০০ কৃষক এবং মাদিয়া মৌজায় ৩০০০ বিঘা জমিতে ১২০০ কৃষক চাষাবাদ করত। এটাই ছিল তাদের জীবিকার প্রধান মাধ্যম। জমিতে আগের মতো ফসল না হওয়ায় এবং জমি আবাদের সুযোগ না থাকায় এদের মধ্যে অনেক কৃষক পেশা থেকে দূরে সরে গেছেন। অনেকে দিন মজুরের কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। অনেকে লবণাক্ত জমিতে অনেক চেষ্টায় ফসল ফলানোর চেষ্টা করছেন। 

প্রতাপনগরের সনাতনকাঠি গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন সরদার লবণে পোড়া ইরি ধানের ধানক্ষেত বাঁচানোর জন্য সেচ দিচ্ছিলেন শেষ বিকেলে। আম্ফানের পর দীর্ঘ সময় ধরে এই এলাকটি লবণ পানিতে ডুবেছিল। মাটিতে লবণের তীব্রতা এখনো কমেনি। সে কারণে ধানের ফলন ভালো হয়নি। অনেক স্থানে ক্ষেত ঝলসে গেছে। আবুল হোসেনের দুই বিঘা জমির মধ্যে দেড় বিঘায় ইরি আবাদ করেছিলেন গত মৌসুমে। এই ধান আবাদে তার ৮ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। পাশের কৃষক হাবিবুর রহমান, নূরুল ইসলাম এবং মোশাররফ হোসেনের ধান ক্ষেতের অবস্থাও একই। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের দুই বছর পর নিজের জমি আবাদ করেছিলেন মোশাররফ। কিন্তু ফলন লবণ মাটিতে হচ্ছে না। গত ইরি মৌসুমে তিনি লোকসান দিয়েছেন ২৫ হাজার টাকা। 

সংকট কাটেনি

পেরিয়েছে ৬ বছর। তবুও সংকট কাটেনি। ৬ বছর ধরে নিজের জীবনের সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেননি পরিতোষচন্দ্র মন্ডল, ৪৫। তার বাড়ি কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের হাজতখালী গ্রামে। ওই গ্রামের আরও অনেকগুলো পরিবার ৬ বছর ধরে কষ্টকর জীবন অতিবাহিত করছেন। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের রাতে এখানে উচ্চ জোয়ারের চাপে বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। কপোতাক্ষ নদীর তীব্র জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম। সেই কারণে এই বেড়িবাঁধের নিকটে বসবাস করতেও এখন মানুষের ভয়।    

পরিতোষ একা নন, হাজতখালী গ্রামের বহু মানুষ বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে, ঊষা রানী, কার্তিক মন্ডল, সুধা রানী, মর্জিনা খাতুন, কবিতা রানী, সঞ্জিত কর্মকারসহ আরো অনেকের নাম উল্লেখযোগ্য। পরিতোষ বলেন, ‘‘এক সময় আমার সব ছিল। নিজের জমিতে কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতাম। কিন্তু এখন কিছুই নাই। পরিবারসহ অন্যের জমিতে বসবাস করি। পরিবারের পাঁচজনের খাবার যোগাড় করি দিন মজুরির মাধ্যমে। এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। দৈনিক তিনবেলা খাবার যোগাড় করাই খুব কঠিন।’’

বেড়িবাঁধের ধারে এখনো বিপন্ন বসতি

ঘুরে দেখা যায়, অনেক স্থানে কৃষি ও চিংড়ির খামার বিরাণ পড়ে আছে। বহু পরিবার এখনও চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছে। সাইক্লোনের পরে অনেকেই জরুরি রিলিফ ছাড়া কোন সহায়তা পায়নি। অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেকেই পুনরায় বাড়িতে ফিরতে পারেনি। আম্ফান বিধ্বস্ত গ্রামগুলোতে লুকিয়ে আছে অনেক হৃদয়বিদারক গল্প। নুরুল ইসলাম তার উপার্জনের একমাত্র ভরসা চারটি গরু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফারুক হোসেন তার ছেলেদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছেন এবং কিশোরী মেয়েটিকে অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাস্তুচ্যুত ফারুক হোসেন সরদার পরিবারসহ খুলনা শহরে গিয়ে পড়েছেন চরম সংকটে।

শুধু সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলায় নয়, জেলার শ্যামনগর উপজেলায়ও একই কাহিনী পাওয়া যায়। খুলনা জেলার পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলায়ও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের দেখা পাওয়া যায়। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। কিন্তু সহায়তার তালিকা ছোট। পুনর্বাসন সহায়তা পেয়েছেন খুব কমসংখ্যক মানুষ। ফলে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ক্ষতিগ্রস্তদের কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে।

প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী বলেন, ‘‘শক্তিশালী সাইক্লোন আম্ফানের আঘাতে প্রতাপনগর ইউনিয়নের মানুষেরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ইউনিয়নের প্রতিটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সাইক্লোনের পরে দেশি-বিদেশি অনেক ভিজিটর এখানে এসেছেন। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির তূলনায় আমরা সহায়তা পাইনি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ঋণ নিয়ে নিজেদের চেষ্টায় টিকে আছে।’’

টেকসই বেড়িবাঁধই সমাধান

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে সবচেয়ে বড় সমস্যা নাজুক বেড়িবাঁধ। একদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত আসছে এই অঞ্চলে, অন্যদিকে এই অঞ্চলের বেড়িবাঁধগুলোই বেশি নড়বড়ে। অনেক স্থানে বড় নিম্নচাপ অথবা ঘূর্ণিঝড়ের দরকার নেই, স্বাভাবিক জোয়ারের চাপেই ভেঙে যেতে পারে বেড়িবাঁধ। এ অঞ্চলের মানুষের কৃষি, মৎস্য খামার, বসতি, জীবিকা সবকিছুই নির্ভর করে বেড়িবাঁধের উপরে। সে কারণে এ অঞ্চলের মানুষেরা দাবি জানিয়ে আসছে শক্ত এবং টেকসই বেড়িবাঁধের। মজবুত বেড়িবাঁধই পারে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে।  

সেচ দিয়ে লবণে পোড়া ধান বাঁচানোর চেষ্টা

প্রতাপনগর গ্রামের বাসিন্দা ওয়াজিয়ার রহমান বলছিলেন, ‘‘প্রাকৃতিক বিপদ আমরা থামাতে পারবো না। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপদে ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে চেষ্টা আমরা করতে পারি। সাইক্লোনের পর আমরা জরুরি রিলিফ চাই না। আমাদের বেড়িবাঁধ শক্ত করে দিন।’’