তরুণদের তামাক ব্যবহার শুরু নিরুৎসাহিত করতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যের দাম কার্যকরভাবে বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে ‘সন্ধানী’।
সংগঠনটি নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে ১০ শলাকার প্যাকেটের মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের মূল্য যথাক্রমে ১৫০ টাকা ও ২০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়।
বুধবার (২০ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ‘তরুণদের তামাক ব্যবহার শুরু নিরুৎসাহিত করতে তামাকপণ্যের কার্যকর দাম বৃদ্ধি: সন্ধানীর বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৬-২৭ অর্থবছর’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদ। এতে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ কারিগরি সহায়তা দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের উপদেষ্টা ডা. হুমাইরা জামিল হিম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডা. মুকাররাবিন-হক নিবিড়। এতে সভাপতিত্ব করেন সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. সাদিকুর রহমান ইফাত।
আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি, যা ৩৫.৩ শতাংশ। দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। পাশাপাশি ১৩-১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের হার উদ্বেগজনক। টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ১৮ শতাংশ।
এতে আরো বলা হয়, ২০২৪ সালে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা রাজস্ব আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও তামাকপণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে কম বেড়েছে। এ সময়ে নিম্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে ১৫.৩৮ শতাংশ, উচ্চ স্তরের সিগারেট ১১ শতাংশ এবং জর্দার দাম প্রায় ১৩ শতাংশ। ফলে তামাকপণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়ে গেছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “তামাকপণ্যের কার্যকর মূল্য বৃদ্ধি তরুণদের ধূমপান শুরু নিরুৎসাহিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। প্রস্তাবিত কর ও মূল্য সংস্কার বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে নিরুৎসাহিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব হবে।”
অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, “দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ তরুণ। ১৮-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ২২.৩ শতাংশ। বর্তমান চার স্তরবিশিষ্ট সিগারেট কর কাঠামো জটিল হওয়ায় ব্যবহারকারীরা সহজেই নিম্নমূল্যের সিগারেটে চলে যান। তাই কার্যকর কর সংস্কারের মাধ্যমে তামাকের সহজলভ্যতা কমানো জরুরি।”
তিনি আরো বলেন, “প্রস্তাবিত কর ও মূল্য সংস্কার বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতে পারে, যা জনস্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।”
সভাপতির বক্তব্যে ডা. সাদিকুর রহমান ইফাত বলেন, “তামাকপণ্যের দাম কার্যকরভাবে বাড়ানো হলে লাখো তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে নিরুৎসাহিত হবে এবং ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগ ও অকাল মৃত্যু কমানো সম্ভব হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে সন্ধানীর সদস্য, তামাকবিরোধী সংগঠনের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।