জ্যেষ্ঠ মাসকে বলা হয় মধু মাস। এ সময়ে আম, কাঠাল ও লিচুসহ বিভিন্ন ধরনের রসালো ফল পাওয়া যায়। অনেকের কাছে লিচু বেশি প্রিয়। কিন্তু, সামর্থ না থাকায় অনেকেই এসব ফল কিনে খেতে পারেন না।
ভাবুন তো, এমন একটি লিচু বাগানে গেলেন, যেখানে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল টসটসে লিচু। আছে ইচ্ছেমতো লিচু পেড়ে খাওয়ার সুযোগ। কিন্তু, তার জন্য আপনাকে একটি টাকাও দিতে হবে না!
কি আশ্চর্য হলেন, তাই তো? ঠিকই শুনেছেন। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি। পাবনায় এমনই একটি লিচুবাগান আছে, যেখানে যে যার ইচ্ছেমতো লিচু পেড়ে খেতে পারবেন আবার বাড়িতেও নিয়ে যেতে পারবেন। তার জন্য কোনো টাকাও দিতে হয় না।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার আলোকদিয়ার গ্রামের কৃষিবিদ মোস্তফা জামাল শামীম গড়ে তুলেছেন এই ব্যতিক্রমী লিচুবাগান। তার ৮ বিঘার জমিতে দুই শতাধিক গাছে আছে নানা জাতের লিচু। শুধু মানুষ নয়, এই বাগানের লিচু পশু-পাখির জন্যও উন্মুক্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে এই বাগান।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হতদরিদ্র মানুষ, দর্শনার্থী ও বন্ধু-স্বজনদের কথা চিন্তা করে এ উদ্যোগ নিয়েছেন বাগানমালিক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও পাবনা শহরের অস্বাস্থসেবা প্রতিষ্ঠান কিমিয়া সেন্টারের স্বত্বাধিকারী কৃষিবিদ মোস্তফা জামাল শামীম। যিনি চিকিৎসাসেবা, শিক্ষাবৃত্তি, মেধাবৃত্তি, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রকৃতি কারণে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি শহরের প্রাণকেন্দ্র আব্দুল হামিদ সড়কে পাবনা কলেজ নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কৃষি বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।
নিজের লিচুবাগানে বন্ধুদের সঙ্গে কৃষিবিদ মোস্তফা জামাল শামীম (মাঝখানে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত)
প্রায় দেড় যুগ আগে তিনি পৈত্রিক ও নিজস্ব অর্থে কেনা জমিতে লিচুর বাগান করেন। গ্রামবাসী, আশপাশের এলাকার হতদরিদ্র মানুষ, বন্ধু-স্বজনরা এসে বিনা পয়সায় ইচ্ছেমতো এই লিচু খেতে পারেন। এই বাগানের লিচু কোনোদিন বিক্রি করা হয় না। মানুষের পাশাপাশি পশু-পাখি যেন এই লিচু খেতে পারে, সেজন্য বাগান করা হয়েছে উন্মুক্ত। নেই কোনো সীমানা প্রাচীর বা কাঁটাতারের বেড়া। খাচা বা জালও ব্যবহার করা হয় না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের একপাশে বয়ে যাচ্ছে ইছামতি নদী। নদীর পাড়ে খোলা মাঠ। নানা ফসলের সমারোহের মাঝেই এই লিচুবাগান গড়ে তুলেছেন কৃষিবিদ শামীম। সারিবদ্ধ গাছগুলো টসটসে লিচুতে ছেয়ে গেছে। নানা-শ্রেণি পেশার নারী-পুরুষ ও শিশুরা আসছেন বিনা পয়সার বাগানে লিচু খেতে। ইচ্ছেমতো লিচু খেয়ে পরিবারের জন্য নিয়েও যাচ্ছেন অনেকে। এ যেন বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই কৃষি উদ্যোক্তা।
বাগান দেখতে আসা কলেজ শিক্ষক আরিফ আহমেদ সিদ্দিকী বলেছেন, “সম্প্রতি ফেসবুকে বিষয়টি দেখতে পাই। তারপর ছুটে এসেছি স্বচক্ষে এমন উদ্যোগ দেখার জন্য। আমি দেখে মুগ্ধ। আসলে মানুষের জন্য কিছু করার সদিচ্ছা থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। এর জ্বলন্ত উদাহরণ কিমিয়া সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা জামাল শামীম।”
দর্শনার্থী পাভেল মৃধা বলেন, “মানুষ ইচ্ছে করলেই মানবিক, উদার আর জনবান্ধব হতে পারেন। বর্তমানে যেখানে কেউ কাউকে ছাড় দেন না, সেখানে ২০০ গাছের লিচু বিনা পয়সায় খাওয়ার জন্য উন্মুক্ত করা কম কথা নয়। নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ, সাধুবাদ জানাই।”
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রাজু আহমেদ বলেন, “ভালো কাজ করে গ্রামকে সবার কাছে আলোচিত করতে একজনই যথেষ্ট। এর উদাহরণ আমাদের গ্রামের কৃতি সন্তান শামীম। তার এই মহতি উদ্যোগের কারণে গ্রামের অনেক মানুষকে বাজার থেকে লিচু কিনে খেতে হয় না। যাদের লিচু খাওয়ার ইচ্ছে হয়, তারা যেকোনো সময়ে লিচু খেতে বাগানে চলে আসেন। বাগানে আসতে কোনো দরজা পেরুতে হয় না। কারো অনুমতিও লাগে না।”
লিচুবাগানের মালিক মোস্তফা জামাল শামীম বলেছেন, “রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না এই লিচুবাগানে। বাগানে নেই নেট বা দেয়াল। মানুষের পাশাপাশি পশু-পাখির জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এই বাগান। গ্রামের মানুষের পাশাপাশি ছোট্ট বাচ্চাদের খুশি করতেই এ উদ্যোগ, যেন বাচ্চারা আনন্দের সাথে নিজে হাতে লিচু পেড়ে খেতে পারে। আমি সব সময় বাগানে বা গ্রামে থাকি না। কিন্তু, যখন শুনি বাগানে নানা শ্রেণির মানুষ দল বেধে এসে লিচু খাচ্ছে, তৃপ্তি পাই, ভালো লাগে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পাবনা জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, “এমন উদ্যোগ সচরাচর কোথাও দেখা যায় না। ধন্যবাদ জানাই বাগানমালিককে এমন ভালো কাজ করার জন্য। অনেক দরিদ্র মানুষ আছে, যাদের ইচ্ছে থাকলেও কেনার সামর্থ্য না থাকায় লিচু খাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। দেশে আরো যারা লিচুবাগানের মালিক আছেন, তারা যদি এমন উদারতা দেখান, তাহলে সমাজের দরিদ্র মানুষ উপকৃত হবেন।”