শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) বিভিন্ন অনুষদে বার বার পরীক্ষা পেছানোর ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তবে প্রশাসনের দাবি, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মতামত ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি কৃষি অনুষদের ‘Principle of Plant Pathology and Seed Pathology’ কোর্সের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, ঘনঘন পরীক্ষা পেছানোর ফলে সেশনজট দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা তাদের কর্মজীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে অপর একটি অংশ পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও দূরপাল্লার যাতায়াত সমস্যার কথা উল্লেখ করে পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তনকে যৌক্তিক বলে মনে করছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, করোনা মহামারীর পর সৃষ্ট ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার যে আশ্বাস প্রশাসন দিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন হয়নি। একাডেমিক ক্যালেন্ডার মেনে পরীক্ষা না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে সেমিস্টার শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান আজাদ বলেন, “আমরা এক বছরের সেশনজট মাথায় নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম এই আশায় যে দ্রুত তা কাটিয়ে উঠব। কিন্তু প্রতি সেমিস্টারেই কোনো না কোনো অজুহাতে পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন রুটিন দিলেও তা ঠিক রাখতে পারছে না। সামান্য আন্দোলন হলেই পরীক্ষা স্থগিত করার এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত।”
শিক্ষার্থীদের মতে, বার বার সূচি পরিবর্তনের কারণে পড়াশোনার গতি ব্যাহত হচ্ছে এবং চাকরির প্রস্তুতিতেও প্রভাব পড়ছে। এর আগেও বিভিন্ন অনুষদে এমন ঘটনা ঘটেছে। কৃষি ব্যবসাব্যবস্থাপনা অনুষদের লেভেল-৩, সেমিস্টার-২-এর একটি মিড-সেমিস্টার পরীক্ষা দুই সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়। একই অনুষদের লেভেল-২-এর ‘Macroeconomics-II’ এবং কৃষি অনুষদের ‘Soil Physics and Soil Chemistry’ পরীক্ষাও তিনবার স্থগিত করা হয়েছিল।
সমালোচকদের মতে, প্রশাসনের অতিরিক্ত শিথিলতা এবং শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রবণতার কারণে একাডেমিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে।
তবে, পরীক্ষা পেছানোর পক্ষে থাকা শিক্ষার্থীদের বক্তব্য ভিন্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, ল্যাব পরীক্ষার কারণে অনেকেই পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় (পিএল) পাননি। এছাড়া, দূরপাল্লার, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের, পরিবহন সংকট এবং মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তনের আবেদন করা হয়েছিল। প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী একত্রে আবেদন করার পরই প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত নেয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. বেলাল হোসেন বলেন, “শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা বিবেচনায় নিয়েই শেষ মুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১৯২টি আবেদন পরীক্ষার পক্ষে এসেছে, আর যথাসময়ে পরীক্ষার পক্ষে ছিল মাত্র ৬টি। তাই অধিকাংশের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এটিকে প্রশাসনের দুর্বলতা বলা ঠিক নয়।”
তিনি আরো জানান, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভদের (সিআর) কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসন আর কোনো পরীক্ষা না পেছানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে, কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক এ. এম. এম. শামসুজ্জামান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নিতে প্রশাসন বাধ্য হচ্ছে। এমনকি শিক্ষকের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।” তার মতে, ‘Soil Physics and Soil Chemistry’ পরীক্ষা তিনবার স্থগিত হওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও মতবিরোধও দায়ী।
তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা বাতিল বা স্থগিতের এই সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে, যা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসা জরুরি।”
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক সমস্যা বিবেচনা করা প্রয়োজন হলেও বারবার পরীক্ষা স্থগিত করা দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর একাডেমিক পরিকল্পনা অনুসরণের দাবি উভয় পক্ষেরই।