বিনোদন

‘আমি মাইকেল জ্যাকসনকে ঘৃণা করি’

ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বিতর্কিত পরিচালক রাম গোপাল ভার্মা। ১৯৮৯ সালে তেলেগু ভাষার ‘শিবা’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তারপর ‘সত্য’, ‘রঙ্গীলা’-এর মতো সিনেমা উপহার দিয়েছেন। এবার এই পরিচালক বললেন—“আমি মাইকেল জ্যাকসনকে ঘৃণা করি।” 

মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্সে (টুইটার) মাইকেল জ্যাকসনকে নিয়ে দীর্ঘ একটি পোস্ট দিয়েছেন রাম গোপাল ভার্মা। এতে তিনি বলেন, “আমি মাইকেলকে ঘৃণা করি। ‘মাইকেল’ সিনেমা দেখার পর আমার স্মৃতি ফিরে গেল—২০০৯ সালের ২৫ জুনের সেই ভয়াবহ দিনটিতে, যেদিন অনেক রাতে ঘুমিয়েছিলাম, আর আমার ঘরের অন্ধকারে টেলিভিশনটা ভূতের মতো গুঞ্জন করছিল। সকালে ঘুম ঘুম চোখে যখন আমার চোখ পর্দার দিকে গেল, আমি কালো পটভূমিতে সেই ভয়ংকর সাদা রঙের অক্ষরগুলো দেখতে পেলাম—‘মাইকেল জ্যাকসন মারা গিয়েছেন।’ বেশ কয়েক সেকেন্ড ধরে আমি ভাবলাম, এটা নিশ্চয়ই দুঃস্বপ্ন। আমি কেন এমন ভয়ংকর কিছু স্বপ্নে দেখব? কিন্তু টিভির ব্যানারটা রয়েই গেল এবং নিউজের টিকারটা হামাগুড়ি দিয়ে চলতে থাকল। আমি রিমোটের দিকে হাত বাড়িয়ে চ্যানেল পাল্টাতে লাগলাম এবং দেখলাম সব সঞ্চালক একইরকম গম্ভীরভাবে কথা বলছেন, আর আমি অবশেষে বুঝতে পারলাম যে অসম্ভব ঘটনাটি ঘটে গিয়েছে।” 

কলেজ জীবনের স্মৃতিচারণ করে রাম গোপাল ভার্মা বলেন, “বিজয়ওয়াড়ায় আমার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের দিনগুলোতে, ১৯৮৪ সালের ২ জানুয়ারি, এক বন্ধু আমাকে নোংরা একটি ভিডিও পার্লারে টেনে নিয়ে যায়, জোর দিয়ে বলে—‘আমাকে কিছু একটা দেখতেই হবে।’ আলো নিভিয়ে দেওয়া হলো, তারপর ‘থ্রিলার’ যেন পেটে এক ঘুষির মতো এসে আছড়ে পড়ল। এটা শুধু একটা গান বা নাচ ছিল না। এটা ছিল এক আগ্রাসন। সারাজীবনের সাধারণত্বে অভ্যস্ত আমার চোখ দুটো যেন হিংস্রভাবে খুলে গেল। প্রযোজনা, কোরিওগ্রাফি, সেই অটুট পরমানন্দ—সবকিছু মিলেমিশে এক স্বর্গীয় সত্তা হয়ে গিয়েছিল। এটা ছিল এমন এক পর্যায়ের দর্শনী, যা আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি, আর সেই ঝড়ের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। মাইকেল জ্যাকসন। তিনি কোনো মানুষের মতো নড়াচড়া করছিলেন না। তিনি ভেসে বেড়াচ্ছিলেন, তিনি বিস্ফোরিত হচ্ছিলেন, তিনি ভাসছিলেন, তিনি পর্দাকে এমনভাবে শাসন করছিলেন যেন, কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য আধিপত্য বিস্তার করতে একটি মানবদেহে প্রবেশ করেছেন।”  

মাইকেল জ্যাকসনকে ঐশ্বরিক কিছু বিবেচনা করে রাম গোপাল ভার্মা বলেন, “আমি হতভম্ব হয়ে সেই পার্লার থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম, আমার হৃদস্পন্দন দ্রুত হচ্ছিল, আমার মাথা ঘুরছিল। এটা সত্যি হতে পারে না। তিনি নিশ্চয়ই ঈশ্বর। অথবা অন্ততপক্ষে পৃথিবীতে আমাদের মতো মরণশীলদের আশীর্বাদ করার জন্য দেবতাদের হাতে গড়া কোনো কল্পনা। তার পরবর্তী প্রতিটি মিউজিক ভিডিও সেই মানকে আরো আরো উঁচুতে নিয়ে গিয়েছে। যেমন—বিট ইট, বিলি জিন, স্মুথ ক্রিমিনাল, ব্ল্যাক অর হোয়াইট, রিমেম্বার দ্য টাইম, ব্যাড ইত্যাদি।” 

মাইকেল জ্যাকসনের প্রতিটি কাজ একটি নতুন নিয়ম ছিল বলে মনে করেন রাম গোপাল ভার্মা। তার ভাষায়, “তার প্রতিটি কাজ ছিল নতুন একটি করে নিয়ম। আমার কর্মজীবনে যতবারই গানের চিত্রায়ণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তা আমার দলের সঙ্গেই হোক বা অন্য পরিচালকদের সঙ্গে, আমরা বারবার তার ভিডিওগুলোর কথাই ভেবেছি। তার কাজ এক অস্পর্শীয় মানদণ্ড হয়ে উঠেছিল, যা ছিল অনুপ্রেরণা এবং বিনয়ের অবিরাম একটি উৎস। আর হ্যাঁ, যেমনটা আমি বললাম, এটা কখনোই শুধু নাচ ছিল না, কখনোই শুধু কণ্ঠ ছিল না। এটা ছিল তার ব্যক্তিত্ব। সেই মানুষটা ছিলেন এক মহাকর্ষীয় শক্তির মতো, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা যেত না।” 

মাইকেল জ্যাকসনের কেলেঙ্কারি, বিতর্ক নিয়ে রাম গোপাল ভার্মা বলেন, “কেলেঙ্কারিগুলো? বিতর্কগুলো? ওগুলো আমাকে কখনোই বিরক্ত করেনি। ওগুলো ছিল পারিপার্শ্বিক কোলাহল। তিনি আমার অনুভূতি, আত্মাকে যা দিয়েছেন, তা কোনো মানুষের আদালত বা ট্যাবলয়েড পত্রিকার যেকোনো সমালোচনার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান ছিল।”  

মাইকেল জ্যাকসনকে কেন ঘৃণা করেন রাম গোপাল ভার্মা? এ প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন এই নির্মাতা। ‘সত্য’ পরিচালক বলেন, “আমার কাছে, তিনি হয় ঈশ্বর ছিলেন অথবা ঈশ্বরের বিশেষ সৃষ্টি ছিলেন, আর ঠিক এ কারণে আমি তাকে ঘৃণা করি। আমি মাইকেল জ্যাকসনকে ঘৃণা করি তার মৃত্যুর জন্য। আমি তাকে ঘৃণা করি এটা প্রমাণ করার জন্য যে, তিনিও একজন মানুষ ছিলেন। আমি ঘৃণা করি, আমাদের বাকিদের মতো তারও অক্সিজেন, রক্তের প্রয়োজন ছিল। আমি ঘৃণা করি তার হৃদস্পন্দনও থেমে যেতে পারত। আমি ঘৃণা করি, আমি সিএনএন-এ সেই কথাগুলো দেখার জন্য একদিন বেঁচে ছিলাম: ‘মাইকেল জ্যাকসনের মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে।” 

মাইকেলকে ঘৃণার কথা যেমন বলেছেন, তেমনই তাকে ভালোবাসার কথাও বলেছেন রাম গোপাল ভার্মা। এ পরিচালক বলেন, “তিনি আমার পিঠে ছুরি মেরেছেন। তিনি আমার কল্পনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনি স্বর্গ ছেড়ে মর্ত্যবাসী হয়ে গেলেন। আমি আপনাকে ঘৃণা করি মাইকেল, আমার স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করার জন্য। আর আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমি আপনাকে এতটাই ভালোবাসি, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আপনি এখন যেখানেই থাকুন, যে মাত্রাতেই থাকুন, আমি নিশ্চিত আপনি ছায়াপথ জুড়ে মুনওয়াকিং করছেন, মহাকাশে ঝড় তুলছেন, এমন এক ঔজ্জ্বল্য নিয়ে, যা তারারাও ধারণ করতে পারে না। আর বিজয়ওয়াড়ার সেই ভিডিও পার্লারে আপনি আমাকে যে ঘোর দিয়েছিলেন, তা আমি আমৃত্যু বয়ে বেড়াব।”