সারা বাংলা

চাকরির প্রলোভনে নেওয়া হয় রাশিয়া, যুদ্ধক্ষেত্রে মাদারীপুরের যুবক নিহত

ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল মাদারীপুরের যুবক সুরুজ কাজীকে (২৬)। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে চাকরির পরিবর্তে তাকে জড়িয়ে ফেলা হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান তিনি। এ ঘটনায় দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সির বিচার দাবি করেছেন স্বজনরা।

নিহত সুরুজ কাজী মাদারীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ খাগছাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার মৃত্যুর খবর পৌঁছালে বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সপ্তাহখানিক আগে সুরুজ মারা গেলেও শুক্রবার (২২ মে) সকলে ঘটনাটি জানতে পারে পরিবার।

আরো পড়ুন: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ হারালেন জাহাঙ্গীর

নিহতের স্বজনরা জানান, প্রায় ১০ মাস আগে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাব পান সুরুজ। তাকে বলা হয়, রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরি দেওয়া হবে এবং পরে ইউরোপে নেওয়া হবে। সেই আশ্বাসে ধারদেনা করে তাকে বিদেশে পাঠায় পরিবার।

রাশিয়ায় যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। পরিবারের অভিযোগ, বাংলাদেশি দালাল ও রিক্রুটিং চক্রের মাধ্যমে তাকে রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়। পরে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত হন তিনি। প্রথমে বিষয়টি গোপন রাখা হলেও শুক্রবার জানাজানি হয়।

রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সাব্বির নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিজের ফেসবুকে দেওয়া ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, তারা একসঙ্গে সাতজন বাংলাদেশি রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ইতোমধ্যে সুরুজ কাজীসহ তিনজন বাংলাদেশি ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। বাকি চারজন এখনো রাশিয়ান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন। তারাও যে কোনো সময় নিহত হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

ভিডিও বার্তায় সাব্বির দাবি করেন, ‘আরাফা আল মনোয়ারা’ নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সি, যার নিবন্ধন নম্বর ১৭৪২ এবং ‘হক ইন্টারন্যাশনাল’ নামে আরেকটি এজেন্সি, যার নিবন্ধন নম্বর ০৪৬- এই দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশি যুবকদের রাশিয়ায় নেওয়া হচ্ছে। তাদের কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলা হলেও পরে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আরো পড়ুন: জনপ্রতি ৩৫ লাখ টাকায় ৩০ বাংলাদেশিকে ‘রুশ আর্মির কাছে বিক্রি’

সাব্বিরের অভিযোগ, ঢাকায় বসে আরিফ চৌধুরী ও জালাল পাটোয়ারী নামে দুই ব্যক্তি পুরো চক্রটি পরিচালনা করছেন। বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে তারা বাংলাদেশি যুবকদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যেতে বাধ্য করছেন।

ভিডিও বার্তায় সাব্বির বলেন, “আরিফ চৌধুরী এবং জালাল পাটোয়ারীর কারণে আমার তিন বন্ধু প্রাণ হারিয়েছে। আমরা কোম্পানিতে কাজ করতে এসেছিলাম, কিন্তু এখন যুদ্ধ করতে বাধ্য হচ্ছি। আমি এদের বিচার চাই।”

তিনি দাবি করেন, বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর অন্তত তিনটি ড্রোন হামলা হচ্ছে। নিহত তিন বাংলাদেশির মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, কারণ সেগুলো ইউক্রেনীয় বাহিনীর অবস্থানের কাছাকাছি পড়ে আছে।

ভিডিও বার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশি ও অন্যান্য বিদেশি সৈনিকদের সামনের সারিতে রাখা হয়, আর রাশিয়ান সেনারা অবস্থান নেয় পেছনে। এতে বিদেশি যোদ্ধাদের মৃত্যুঝুঁকি আরো বেড়ে যাচ্ছে। সাব্বিরের দাবি, এই চক্রটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে আরো ২১ জনকে রাশিয়ায় নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

নিহত সুরুজের বাবা শাহাবুদ্দিন বলেন, “আমার ছেলেকে ভালো চাকরির কথা বলে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। আমরা গরিব মানুষ, ছেলেটা সংসারের হাল ধরতে গিয়েছিল। এখন আমার ছেলেকে আর ফিরে পাব না। যারা তাকে প্রতারণা করে যুদ্ধের মধ্যে পাঠিয়েছে তাদের বিচার চাই।”

মা নুরজাহান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেটা বলেছিল, টাকা আয় করে সংসারের কষ্ট দূর করবে। এখন আমি কার মুখ দেখে বাঁচব? আমি শুধু আমার ছেলের লাশটা দেশে ফেরত চাই।”

স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার বলেন, “আমার স্বামী কাজ করতে গিয়েছিল, যুদ্ধ করতে নয়। আমাদের ছোট সংসারটা শেষ হয়ে গেল। আমি এই প্রতারণার বিচার চাই।”

বোন সারমিন বলেন, “ভাই বিদেশ যাওয়ার আগে বলেছিল আমাদের ভালোদিন আসবে। কিন্তু, এখন সব শেষ হয়ে গেছে। যারা মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে তাকে পাঠিয়েছে তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।”

চাচাতো ভাই ইয়াদুল ইসলাম বলেন, “দালাল চক্র সাধারণ মানুষকে টাকার লোভ দেখিয়ে বিদেশে পাঠাচ্ছে। পরে তাদের যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। প্রশাসনের উচিত এসব রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।”

সুরুজের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং অসচ্ছল পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। একই সঙ্গে বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে।

মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আল নোমান বলেন, ‍“নিহত সুরুজ কাজীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।” পাশাপাশি বৈধ ও নিরাপদ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।