চলতি বছরের ১৪ মে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) নবম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন এবং ২০০৭ সালে কুবির ইংরেজি বিভাগে যোগ দেন। এর আগে তিনি বিভাগীয় প্রধান, কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তার বিভিন্ন পরিকল্পনা, সংকট ও সম্ভাবনার কথা। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রাইজিংবিডির কুবি প্রতিনিধি এমদাদুল হক।
রাইজিংবিডি: স্যার, আপনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেবেন? আপনার প্রধান ভিশন ও মিশন কী?
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম: বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আমাদের সবার যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করাই আমার লক্ষ্য। আমি সবসময় ‘স্টুডেন্টস ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বাস করি। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, আনন্দময় ও আধুনিক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমার প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার।
উন্নত ডাইনিং ব্যবস্থা, মানসম্মত ক্লাসরুম, আধুনিক কারিকুলাম, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা, চিকিৎসাসেবা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই। শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, মানবিক ও শিক্ষাবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলাই আমার ভিশন।
রাইজিংবিডি: শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে আপনি কোন দিকে বেশি গুরুত্ব দেবেন?
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম: নিয়োগে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি থাকবে না। দলমত বা ব্যক্তিগত প্রভাবের বাইরে থেকে দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। অস্পষ্টতা রেখে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া উচিত নয়। কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হবে, তা আগে থেকেই প্রার্থীদের জানিয়ে দেওয়া হবে। আমরা একটি নিয়োগ বিধিমালা তৈরি করবো এবং সেই বিধির আলোকেই নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
রাইজিংবিডি: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা ও একাডেমিক মান উন্নয়নে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে চান?
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম: শিক্ষা ব্যবস্থা ও একাডেমিক মান উন্নয়নে ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেল (আইকিউএসি) সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। আউটকাম বেইজড এডুকেশন (ওবিই) বাস্তবায়নেও আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক বিদেশে পিএইচডি করছেন। তারা ফিরে এসে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একাডেমিক কারিকুলামে যুক্ত করছেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি বিভাগ অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আবেদন করেছে। আইকিউএসি তাদের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ডও নির্ধারণ করেছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ ও শিক্ষার মানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশা করছি।
রাইজিংবিডি: শিক্ষার্থীদের আবাসন, পরিবহন, ডাইনিং এবং চিকিৎসাসেবা নিয়ে আপনার প্রশাসনের কী পরিকল্পনা থাকবে?
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম: দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আমি ‘স্টুডেন্টস ফার্স্ট’ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি। সেই ভাবনা থেকেই শিক্ষার্থীদের ডাইনিং, পরিবহন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শুরুতে যেসব কাজ স্বল্প ব্যয়ে বাস্তবায়ন সম্ভব, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ডাইনিংয়ের মান উন্নয়নের জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করা হবে। তারা ডাইনিংগুলো পর্যবেক্ষণ করে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ভাগ করবে। পরিবহন ব্যবস্থায় যানবাহন পর্যাপ্ত থাকলেও চালকের সংকট রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ করছি। চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে একজন টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফার্মাসিস্ট নিয়োগের বিষয়েও ফার্মেসি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করেছি।
রাইজিংবিডি: শিক্ষক রাজনীতি প্রসঙ্গে কি বলবেন?
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম: শিক্ষক রাজনীতি থাকার সুযোগ নেই। শিক্ষকরা রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক হতে পারেন, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া উচিত নয়। শিক্ষকদের সংগঠন দলীয় সংগঠন না হয়ে পেশাজীবী সংগঠন হওয়া উচিত ।পেশাগত দাবি আদায়ের জন্য শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং সমিতি করার অধিকার রয়েছে। সেখানে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই।
রাইজিংবিডি: গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিষ্ঠিত করতে আপনার পরিকল্পনা কী?
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম: আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কুবিকে প্রতিষ্ঠা করতে গবেষণা ও ফান্ডিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গবেষণা সেলও এ লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য ফান্ড দেওয়া হচ্ছে। আমার বিশ্বাস, আধুনিক কারিকুলামের মাধ্যমেই একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব।
রাইজিংবিডি: শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা এবং নেতৃত্ব বিকাশে আপনার উদ্যোগ কী?
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম: শিক্ষাকে আনন্দময় করতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কয়েকটি খেলাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে চাই। মেয়েদের ভলিবলকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। ক্রিকেটেও নির্দিষ্ট দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া সম্ভব। যেমন— শুধু ব্যাটিং কোচ নিয়োগ দিয়েও দক্ষ ব্যাটসম্যান তৈরি করা যায়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্রও বটে। কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা। সংগঠনগুলোর অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়ে সাউন্ড সিস্টেম, মঞ্চ ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়।আমার পরিকল্পনা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সাউন্ড সিস্টেম ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা, যাতে কম খরচে সংগঠনগুলো সেগুলো ব্যবহার করতে পারে। মুক্তমঞ্চকে স্থায়ী ছাউনির আওতায় আনার বিষয়টিও ভাবছি। এতে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রম আরো সহজ ও প্রাণবন্ত হবে।
রাইজিংবিডি: শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, র্যাগিং এবং মাদকের বিষয়ে আপনাদের কী পদক্ষেপ থাকবে?
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম: বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং ও মাদক একটি জাতীয় সমস্যা। এসব কমিয়ে আনতে হলে ইতিবাচক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। আমরা যদি নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারি, তাহলে শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে বেশি সম্পৃক্ত হবে এবং এসব সমস্যাও কমে আসবে।
মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ার বিষয়টিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব গুরুত্ব দিচ্ছি। নারী শিক্ষার্থীদের রাতের বেলায় হলের বাইরে থাকার সময় কমিয়ে আনতে প্রভোস্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এছাড়া যারা টিউশনের কারণে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকে, তাদের তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
রাইজিংবিডি: নতুন ক্যাম্পাস ও নতুন বিভাগ খোলা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম: নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পের বাকি কাজের অনুমোদনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় আবেদন করা হয়েছে। তবে বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে, দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না। তাই বর্তমান ক্যাম্পাসের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই ক্যাম্পাসেই নতুন বিভাগ খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষদের ক্লাসরুমের অবস্থা পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে নতুন ক্লাসরুম ও ভবন নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হবে। খুব দ্রুত এসব কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাইজিংবিডি: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময় দিক এবং প্রধান চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম: আমাদের স্বপ্নময় ও সম্ভাবনামুখী হতে হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক হিসেবে আমি দেখেছি, আমাদের অনেক শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফুল ফান্ডেড পিএইচডির সুযোগ পাচ্ছে। যেখানে আমার নিজেরও যাওয়ার সুযোগ হয়নি। এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
আমাদের লাইব্রেরি এখনো পর্যাপ্ত সমৃদ্ধ নয়, ক্লাসরুম সুবিধা সীমিত, খাবারের মান ও ইন্টারনেট সেবাতেও ঘাটতি রয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সেটিই আমাদের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা। আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও ধাপে ধাপে শিক্ষার্থীবান্ধব ও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাব।
রাইজিংবিডি: ধন্যবাদ, স্যার আপনাকে।
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম: ওকে, ভালো থাকবেন।