রাইজিংবিডি স্পেশাল

১৭ বছর আইলার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে মানুষ 

সবুজ ফসলি মাঠ ডুবে থাকে লবণ পানিতে। কোথাও চিংড়ি চাষ, কোথাও-বা পতিত জমি। উর্বর ফসলি জমিতে জমে লবণের আস্তরণ। কোথাও আবাদের পর পুড়ে যাচ্ছে ফসল। উঠছে না উৎপাদন খরচ। খাদ্য ও জীবিকার সন্ধানে মানুষ ছুটছে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। বংশ পরম্পরায় কৃষিকাজে জীবিকানির্বাহ করা পরিবারগুলো অন্য পেশায় যাচ্ছে। স্থায়ী এবং মৌসুমী অভিবাসনের মাত্রা অনেক বেড়েছে। ইটভাটার কাজ, ধান রোপণ-কাটাসহ বিভিন্ন কাজে দলে দলে মানুষ ছুটছে অন্য স্থানে। সীমান্ত পাড়ি দেওয়া মানুষগুলো ১৬-১৭ বছর পরে আবার ফিরেছে দেশে। ঘূর্ণিঝড় আইলা দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের মানুষের কাঁধে দুঃসহ যে বোঝা তুলে দিয়ে গেছে তা থেকে পরিত্রাণ মিলছে না। শুকোচ্ছে না সবহারা মানুষের হৃদয়ের ক্ষত। 

আজ প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলার ১৭ বছর। ২০০৯ সালের ২৫ মে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে আইলা আঘাত করেছিল বাংলাদেশের উপকূলে। এর প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলো। আইলায় উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি না হলেও উচ্চ জলোচ্ছ্বাসে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে ব্যাপক। কৃষি জমি, চিংড়ির খামার, পুকুর, ডোবা সবকিছু লবণের বিষে আক্রান্ত হয়। ফলে জীবন জীবিকায় চরম সংকট দেখা দেয়। ১৭ বছর পরেও ওই অঞ্চলের মানুষ আইলার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। 

‘‘আমাদের সব সমস্যার মূলে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলা। ঘূর্ণিঝড়ে আমাদের গ্রামের সবুজ হারিয়ে গেছে। ওই সাইক্লোনে বেড়িবাঁধ ধ্বসে লবণ পানি প্রবেশ করেছিল। লবণ পানির তলায় ডুবে গিয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম। লবণাক্ততায় গ্রামে ধান চাষ করা সম্ভব ছিল না। এলাকার মানুষেরা বাধ্য হয়ে ধানের জমিতে চিংড়ি চাষ শুরু করে। সাইক্লোন আমাদের এলাকার দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। আমাদের পেশা বদলে দিয়েছে,’’ — কথাগুলো বলছিলেন দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলের খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার কাটমারচর গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মাজেদ।  

আবদুল মাজেদ ছাড়াও গ্রামটির আরো অনেকে ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্পদ হারিয়েছে, পেশা বদলেছে। শুধু কয়রা নয়, গোটা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষেরা আইলার আঘাতে বিপর্যস্ত। ওই অঞ্চলের মানুষের সংকটের প্রসঙ্গ আলোচনায় এলে আইলাকে নির্দেশ করেন। সব সমস্যার মূলেই যেন আইলা। কেননা, আইলা ছিল কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির ঘূর্ণিঝড়। উচ্চ জলোচ্ছ্বাসে আসা লবণ পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছিল সব। ফলে মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বাড়ে। একে ঘিরেই পরবর্তীতে অন্যান্য সংকট তৈরি হয়।  

বদলে গেছে কৃষিচিত্র

দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের মানুষেরা আগেকার দিনের ধান আবাদের কথা মনে করতে পারেন না। বয়সী ব্যক্তিরা বলেন, আইলার আগে এ এলাকায় প্রচূর ধান হতো। আগে বাইরের জেলাগুলো থেকে এ এলাকায় ধান কাটতে আসত অনেক মানুষ। এখন এলাকার মানুষ অন্যত্র যায় ধান কাটতে।  

কয়রা উপজেলার গাতিরঘেরী গ্রামের বাসিন্দা বিজয় কৃষ্ণ সরকার বলেন, ‘‘আমি সারাজীবন ধান চাষ করে জীবিকানির্বাহ করেছি। জমিতে ধানের উৎপাদন ছিল খুব ভালো। আইলার পর থেকে অবস্থা দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় আমরা চিংড়ি চাষ শুরু করি। কিন্তু ঘন ঘন সাইক্লোনে চিংড়ি চাষও বহুমুখী সমস্যার মুখোমুখি। এখন আমাদের এলাকায় টিকে থাকাই কঠিন।’’  

নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থা

সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের কৃষক আবদুস সামাদ আইলায় সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। এরপরে আরো অনেক প্রাকৃতিক বিপদ মোকাবিলা করেছেন। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের পর তার জমিতে ধান চাষ বন্ধ। ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ওই এলাকা দশ মাসেরও বেশি সময় লবণ পানির তলায় ছিল। লবণাক্ততায় ওই এলাকার গাছপালা মরে গেছে। মাঠের সবুজ ঘাসও মরে গেছে। কৃষক ধান চাষের মাধ্যমে এলাকায় সবুজ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মাটি ও পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে তা কঠিন হচ্ছে।  

আবদুস সামাদ বলেন, ‘‘আমাদের বড় ক্ষতি করেছে আইলা। লবণ পানি এসে মাটি ও পানি লবণাক্ত করে দিয়েছে। যা অন্যান্য সমস্যা তৈরি করেছে। মানুষজন এলাকায় বসবাস করতে পারছেন না। অনেকে কাজের সন্ধানে শহরে চলে যাচ্ছেন।’’ 

সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের সুন্দরবন লাগোয়া এই এলাকায় এক সময় বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদন হতো। কিন্তু ঘন ঘন প্রাকৃতিক বিপদ এলাকার অবস্থা বদলে দিয়েছে। জীবন জীবিকায় চরম সংকট দেখা দিয়েছে। কাজের সন্ধানে এলাকার মানুষেরা যাচ্ছে অন্যত্র। অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক বিপদ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার মানুষের জীবনের লড়াই আরো কঠিন করে দিয়েছে। এই এলাকার এক হাজার জনের মধ্যে সাতশ জনই বাইরে কাজে চলে গেছে।

শুধু কয়রা উপজেলায় নয়, বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলের আরো কয়েকটি উপজেলার দৃশ্যপট ঠিক একই রকম। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত লাগোয়া সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা এবং আশাশুনি উপজেলার প্রাকৃতিক বিপদের প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবে। খুলনা জেলার কয়রা উপজেলা, দাকোপ উপজেলা এবং পাইকগাছা উপজেলার দৃশ্যপটও একই রকম। আইলার ক্ষতির সাথে যুক্ত হয় পরবর্তী সময়ের ঘূর্ণিঝড়গুলোর প্রভাব। বেড়িবাঁধ দুর্বল থাকার কারণে ওই এলাকাগুলো স্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। 

জোয়ারের পানির চাপে দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এতে মানুষের বাড়িঘর এবং ফসলি ক্ষেতের ক্ষতি হয়। বারবার ক্ষতির মুখে পড়ে ওই অঞ্চলের বহু পরিবারে সংকট বেড়ে যায়। এ কারণে বাস্তুচ্যুত পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। ওই অঞ্চলের মানুষের বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—  সুপেয় পানির সংকট, কৃষি সমস্যা, স্বাস্থ্য সমস্যা, শিক্ষা সমস্যা, বসবাসের সমস্যা, কর্মসংস্থানের অভাব ইত্যাদি।

জীবিকার বিকল্প পথ

জীবিকার বিকল্প পথে ছুটছে মানুষ। এলাকায় কাজ না থাকায় যাচ্ছে বাইরে, ইটভাটায় অথবা শহরে অন্য কোন ভারি কাজে। যা অচেনা-অজানা। যা কঠোর পরিশ্রমের। কেউ পাড়ি দেয় সীমান্ত। অনেকে বিকল্প জীবিকা হিসাবে বেছে নেয় সুন্দরবনের কাজ। কৃষি মাঠ এবং চিংড়ি খামার থেকে কর্মহীন মানুষদের মধ্যে অনেকে সুন্দরবনে জীবিকার জন্য যায়। কিন্তু সেখানে আবার দস্যুর ভয়। কয়রা উপজেলার দক্ষিণে সুন্দরবন লাগোয়া ঘড়িলাল, চরামুখা এবং আংটিহারা গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, ফসলি মাঠ ফাঁকা। লবণাক্ততার কারণে এসব মাঠে এখন আর সবুজ নেই। এই কৃষি মাঠে যারা কাজ করতেন, তারা এখন জীবিকার জন্য অন্যত্র চলে গেছে। গ্রামগুলোর গা ঘেঁষে শাকবাড়িয়া নদী। এই নদীর ওপারেই সুন্দরবন। কিন্তু সেখানেই আগের মত উপার্জন নাই। 

কয়রা উপজেলার ইউনিয়ন কাউন্সিলগুলো সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার অধিকাংশ এলাকার মাটিতে লবণাক্ততা মিশে গেছে। ফলে উপজেলায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষি জমি অনাবাদী রয়েছে। নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে আরো ৪০০ হেক্টর কৃষিজমি। পানি ও মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় চিংড়ি ব্যবসায় লোকসান গুনতে হচ্ছে এ এলাকার চাষিদের। অনেকে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন। কয়রা উপজেলা মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর এ উপজেলার নদীর পানিতে লবণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৫-৬ পিপিটি পর্যন্ত লবণের মাত্রা এ এলাকার জন্য সহনীয়। অথচ গ্রীষ্মকালে তা ২৫-৩০ পিপিটি পর্যন্ত বেড়ে যায়। এ জন্য চিংড়ি চাষেও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জোয়ারের চাপে বাঁধ ভেঙে চিংড়িঘের ভেসে যায়। প্রতিবছর লোকসানের কারণে অনেকেই পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন।

পুরুষের সাথে নারীরাও সুন্দরবনে কাজে যায় 

দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলের সুন্দরবনের নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাকৃতিক বিপদের কারণে প্রতি বছর অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এদের মধ্যে একটি বড় অংশ কাজের জন্য ভারতে যায়। অনেকে দেশের বড় শহরগুলোতে কাজের জন্য যায়। ভারতে যাওয়ার কারণ হিসাবে পরিবারগুলো বলেছে, সেখানে উপার্জনের সুযোগ অনেক বেশি।

হালিম, ফারুক এখন কী করবেন

"আমি সংকট থেকে বাঁচতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পার হয়েছিলাম, কিন্তু সেই সংকট আমাকে পিছু ছাড়েনি। জীবনের শেষ প্রান্তে, আমাকে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।" — আবদুল হালিম, ৪ নম্বর কয়রা, খুলনা, বাংলাদেশ

ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ১৩ বছর পর, ৬২ বছর বয়সী আব্দুল হালিম সরদার তার পরিবার নিয়ে ভারত থেকে নিজের বাড়ি ফিরে এসেছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে, তিনি আবার শূন্য থেকে জীবন শুরু করছেন। এখন হালিম জানেন না যে তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সাথে পরবর্তী দিনগুলি কীভাবে অতিবাহিত করবেন! আইলার কারণে পানির তলায় বাড়িঘর, কৃষিজমি ডুবেছিল বহুদিন। অনেকেই তাদের কর্মসংস্থান হারিয়ে ফেলে। ফলে বহু মানুষ কাজের সন্ধানে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী ভারতে চলে যান। আব্দুল হালিম সরদার তাদেরই একজন। সেখানে তার পরিবার নিয়ে জীবন চলছিল ভালোই। মাসিক আয় ছিল ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু হালিম জানতেন না যে ১৩ বছর পর, তাকে একটি সংকটময় পরিবেশে দেশে ফিরে আসতে হবে।

হালিম ‘জলবায়ু অভিবাসী’ হিসেবে জীবিকা নির্বাহের জন্য দেশ ছেড়েছিলেন। এখন তাকে ‘শরণার্থী’ হিসেবে নিজের দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। সুন্দরবনে কাজ করতে যেতে এখন দস্যুদের ভয়। ইতোমধ্যে বনে গিয়ে হালিম দস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে আর যাচ্ছেন না। পরিবার চালানোর জন্য অর্থ উপার্জনের কী ব্যবস্থা করা হবে তা জানেন না হালিম। বাংলাদেশের খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন একটি গ্রামে আব্দুল হালিম সরদারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। একদিকে হালিমের বাড়িটি, অন্যদিকে সুন্দরবন। মাঝখানে প্রবহমান নদী। বর্ষাকালে, হালিমের বাড়ি ডুবে জোয়ারে। কখনও কখনও তাকে বাঁধে আশ্রয় নিতে হয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হালিম জানেন না, সামনের দিনগুলো কীভাবে চালিয়ে নিবেন!

আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত ফারুক হোসেনের বাড়ি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া গ্রামে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ফারুক হোসেনের জীবনকে ওলটপালট করে দিয়েছে। ছোটবেলা থেকে অনেকগুলো দুর্যোগের মুখে পড়েছেন। এর মধ্যে আইলা ফারুকের নিজের গড়ে তোলা সংসারে ধাক্কা দিয়েছিল বড় করে। এতে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েন।  আইলায় ক্ষয়ক্ষতির পরে ফারুক হোসেন ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন। পরিবার নিয়ে তিনি সেখানে একটি বস্তিতে বসবাস করেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য রাস্তায় কাগজ কুড়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের কাজ করেছেন। সেখানে বেশ কয়েক বছর অবস্থানের পরে নানান ধরণের সমস্যা দেখা দেয়। ফারুক হোসেন আবার দেশে ফিরে আসেন। জমানো টাকা দিয়ে কুড়িকাহুনিয়া গ্রামে নিজের জমিতে বসবাসের ঘর তৈরি করেন। কিন্তু ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান এবং ঘূর্ণিঝড় ইয়াস-এ সব সম্পত্তি হারিয়েছে ফারুক হোসেন। তার পরিবারের সংকট আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। 

দুর্যোগের কারণে বারবার বসতি স্থানান্তর করতে হয়

ফারুক হোসেনের মত আরো অনেক পরিবারের সাথে আলাপ করে তাদের সংকটের কথা জানা গেছে। জীবন জীবিকার জন্য ভারতগামী পরিবারগুলোর সূত্র বলেছে, ভারতের বিভিন্ন এলাকায় নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার আছে, যারা বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক বিপদের মুখে পড়ে সীমান্ত অতিক্রম করেছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই আইলার পরে জীবন জীবিকার জন্য ভারতে গেছে। এদের মধ্যে একটি অংশ পরিবারসহ ভারতে গেছে। অনেকে মৌসুম-ভিত্তিক কাজের জন্য ভারতে গিয়ে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসে। বৈধভাবেই তারা সেখানে কাজ করে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এই মানুষের ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটা, ধান রোপণ, ইট বানানো, বাসাবাড়ি পরিষ্কার, রাস্তায় কাগজ কুড়ানো ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত।

‘‘আমি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে বারবার হেরে গিয়েছি। আইলার পরে আমি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। ভারত থেকে দেশে ফেরার পরে আমি ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে সব হারাই,’’ বলছিলেন ফারুক হোসেন। 

আইলার ক্ষত ঝুলন্ত গ্রাম

সুন্দরবনের নিকটবর্তী শিবসা নদীতে জেগে আছে একটি ছোট্ট দ্বীপ। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট কতগুলো ঝুলন্ত ঘর। জোয়ারের পানি বারবার দ্বীপটিকে ডুবিয়ে দেয়। তবুও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা সেখানে বসবাস করতে বাধ্য হন। কখনো জোয়ারের ভয়, ঘূর্ণিঝড়ের ভয়, কখনো বাঘ, কুমির, সাপের ভয়। এসব ভয় উপেক্ষা করে তারা উপার্জন এবং জীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য সেখানে বসবাস করে। এদের অন্যত্র যাওয়ার স্থান নেই; পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে।

এটি দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের সুন্দরবনের নিকটবর্তী ঝুলন্ত গ্রাম কালাবগির গল্প। ২০০৯ সালের ২৫ মে সাইক্লোন আইলার আঘাতে খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নের কালাবগি গ্রামটি পরিণত হয়েছিল ঝুলন্ত গ্রামে। সেসময় ঝুলন্ত গ্রামটি ছিল অনেক বড়। ৫ শতাধিক বাড়ি ছিল। কিন্তু আইলার পর ঘন ঘন কয়েকটি সাইক্লোন গ্রামটিকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করেছে। এরই একটি অংশ সুন্দরবন লাগোয় এই দ্বীপটি। কিন্তু কালাবগি গ্রামটি ছিল ভূমিতে। সবুজে ঘেরা ছিল গ্রামের বাড়িঘরগুলো। মাঠে ফসল হতো। গ্রামের অধিকাংশ পরিবার কৃষি নির্ভর জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন পুরো গ্রামের মানুষের দুর্দশার শেষ নেই। তাদের উপার্জনের ভরসা নদী এবং সুন্দরবন। কিন্তু সে উপার্জনের পথেও রয়েছে অনেক প্রতিবন্ধকতা।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, আইলার প্রলয় দিয়ে কালাবগি গ্রামের ভিন্ন জীবনের সূত্রপাত মাত্র। অন্যান্য দুর্যোগগুলোও এদের উপর দিয়ে যায়। বেড়িবাঁধের বাইরে বিপন্ন অবস্থায় থাকার কারণে ঝড়ের ঝাপটায় আরও বেশি প্রভাবিত হয় তারা। বড় ঝড়ের ধাক্কা প্রয়োজন হয় না, বর্ষাকালের প্রবল জোয়ারেই এদের ব্যাপক ক্ষতি করে দিয়ে যায়। ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের পরে গ্রামটি আরও বদলে যায়। ঝুলন্ত গ্রামটি ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গেছে আম্ফানের প্রবল তোড়ে। এখন গ্রামের একাংশ পরিণত হয়েছে দ্বীপে। সুন্দরবন লাগোয়া সেই ছোট্ট দ্বীপে বসবাস কারে প্রায় ১০০ পরিবার। এদেরকে মূল ভূ-খন্ডে যেতে হয় ভয়াল শিবসা নদী পার হয়ে। ঘূর্ণিঝড় আইলা এভাবেই একে একে ওই এলাকার মানুষের জীবনধারা বদলে দিয়েছে।

কালাবগি গ্রামের বাসিন্দা সনাতন মন্ডল বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আইলা’র ক্ষত হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে গ্রামটি। আইলার আগে এখানে ছিল সবুজ গ্রাম। এখানে ছিল না কোন ঝুলন্ত গ্রাম। প্রত্যেক বাড়িতে ছিল সবুজ গাছপালা। সুন্দরবনে এবং শিবসা নদীতে নানান কাজে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে মানুষগুলো বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আইলা এসে এখানকার মানুষের সেই সুদিন কেড়ে নেয়। কালাবগি নতুন নাম পায় ‘ঝুলন্ত গ্রাম’।’

পরিসংখ্যান ভয় দেখায়

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূল খুব বেশি সংকটের মুখোমুখি। ঘন ঘন সাইক্লোন এলাকাটিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলা, ২০১৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ফণী এবং ঘূর্ণিঝড় বুলবুল, ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্ফান, ২০২১ সালের ঘূর্ণিঝড় ইয়াস এবং আরো অনেক প্রাকৃতিক বিপদের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলের মানুষ। 

বহু এলাকায় বেড়িবাঁধ এখনো নাজুক

বাংলাদেশের উপকূলে ঘন ঘন সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে গত দুই দশকে বহু মানুষ বাড়িঘর স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছেন। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি)-এর ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট ২০২১’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার ২৩০ জন মানুষ। তাদের প্রায় সবাই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে উদ্বাস্তু হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগামীতে বাস্তুচ্যুত মানুষদের সংখ্যা অনেক বাড়বে বলে আংশকা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ গ্রাউন্ডসওয়েল প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ২১ কোটির বেশি মানুষ ঘরছাড়া হতে পারে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে রয়েছে চার কোটির বেশি মানুষ। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শুধু বাংলাদেশেই ১৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।