ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানি বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও পারস্য উপসাগরে মাইন স্থাপনের চেষ্টায় নিয়োজিত বোটগুলোকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৬ মে) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, এই অভিযানটি সম্পূর্ণ ‘আত্মরক্ষার্থে’ এবং ‘ইরানি বাহিনীর হুমকি থেকে মার্কিন সেনাদের রক্ষা করার’ উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছে।
সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, “দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও মার্কিন সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ সংযম বজায় রেখে নিজেদের বাহিনীকে রক্ষা করে চলেছে।”
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সোমবার রাতে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কৌশলগত বন্দর শহর বন্দর আব্বাসের নিকটবর্তী একটি এলাকায় এই হামলা চালানো হয়। হরমুজ প্রণালির প্রবেশদ্বারে অবস্থিত এই শহরটি ইরানের একটি অন্যতম প্রধান নৌঘাঁটি।
এদিকে, ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর স্থানীয় কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। তবে এই মার্কিন হামলার বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো পাল্টা প্রতিক্রিয়া বা জবাব দেওয়া হয়নি।
এই হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিতে কী প্রভাব পড়বে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এখনো একটি চুক্তির ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
বর্তমানে ভারত সফরে থাকা রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, “একটি চুক্তি এখনো সম্ভব।” তিনি মঙ্গলবার ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে হতে যাওয়া বৈঠকের দিকে ইঙ্গিত করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, “আমরা দেখব অগ্রগতি করা যায় কিনা। আমার মনে হয় প্রাথমিক দলিলের নির্দিষ্ট শব্দ বা ভাষা নিয়ে অনেক আলোচনা চলছে, তাই এতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে।”
তিনি আরো জানান, “প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটি (চুক্তি) করার ‘ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন’। তিনি (ট্রাম্প) হয় একটি ভালো চুক্তি করবেন, নয়তো কোনো চুক্তিই করবেন না।”
ইরানের ওপর নতুন হামলার বিষয়ে পরে জানতে চাওয়া হলে রুবিও বলেন, “প্রণালিটি (হরমুজ প্রণালি) খোলা রাখতেই হবে। যেকোনো উপায়েই হোক এটি খোলা থাকবে, তাই এটি খোলা থাকা প্রয়োজন। সেখানে যা ঘটছে তা বেআইনি, অবৈধ, বিশ্বের জন্য টেকসই নয় এবং এটি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
এর আগে, চলতি মাসের শুরুর দিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি ও মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের মধ্যে একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল- যার জন্য উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করে। তবে ওই ঘটনার পরও ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে।
গত সপ্তাহের শেষের দিকে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, উভয় পক্ষ চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছে। কিন্তু পরে তিনি জানান, তিনি আলোচনাকারীদের নির্দেশ দিয়েছেন চুক্তি করার জন্য ‘তাড়াহুড়ো না করতে’। অন্যদিকে রুবিও বলেছিলেন, সোমবারই হয়তো একটি চুক্তি হতে পারে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো ‘ঘনিয়ে আসেনি’।
আলোচনাধীন সমঝোতা স্মারকটিতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরো আলোচনার পরিকল্পনার কথা রয়েছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই আলোচনাগুলোর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে না। বিতর্কিত বিষয়গুলো, যেমন ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা তহবিল মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে মার্কিন দাবি- পরবর্তী সময়ে আলোচনা করা হতে পারে।
যুদ্ধের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা পারমাণবিক বোমা তৈরির অস্ত্রের গ্রেড (৯০ শতাংশ) থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে।
সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জানান, এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয় ‘অবিলম্বে’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, অথবা ‘পছন্দসইভাবে’ ইরানের সঙ্গে যৌথ সমন্বয় ও সহযোগিতার মাধ্যমে যেখানে আছে সেখানেই ধ্বংস করতে হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে ব্যাপক হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এই যুদ্ধ শুরু হয়। ইরান এর জবাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়। গত ৮ এপ্রিল থেকে দুই পক্ষ একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি মেনে চললেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও বন্দর অবরোধ নিয়ে এখনো চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।