সাতসতেরো

জমজম কূপের ইতিহাস

ইসলামের ইতিহাসে জমজম কূপ এক অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। হাজার হাজার বছর আগে মহান আল্লাহ নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর স্ত্রী হাজেরা (আ.) এবং শিশু পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর তৃষ্ণা নিবারণের জন্য এই কূপ সৃষ্টি করেছিলেন। মুসলমানদের কাছে এটি শুধু একটি পানির উৎস নয়, বরং আল্লাহর রহমত, কুদরত ও ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক।

জমজম কূপ সৃষ্টির ঘটনা পবিত্র কোরআনের সুরা ইবরাহিম এবং বিভিন্ন হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসগ্রন্থে জমজম কূপের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। সহিহ আল-বুখারিতে বর্ণিত আছে, আল্লাহর নির্দেশে নবী ইব্রাহিম (আ.) স্ত্রী হাজেরা ও শিশু ইসমাইলকে অনাবাদী মরুভূমি মক্কায় রেখে যান। তখন সেখানে মানুষের বসতি বা পানির কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

হাজেরা (আ.) ইব্রাহিম নবীকে প্রশ্ন করেছিলেন— “আপনি কি আল্লাহর নির্দেশে আমাদের এখানে রেখে যাচ্ছেন?”

নবী ইব্রাহিম (আ.) সম্মতি দিলে হাজেরা (আ.) বলেন— “তাহলে আল্লাহ অবশ্যই আমাদের নষ্ট করবেন না।”

কিছুদিন পর তাদের খাদ্য ও পানি শেষ হয়ে যায়। তৃষ্ণায় কাতর শিশু ইসমাইল (আ.) কান্না শুরু করলে মা হাজেরা পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়ান। এই ঘটনাকেই হজের সাঈ হিসেবে স্মরণ করা হয়।

মসজিদুল হারাম-এর ভেতরে জমজম কূপ রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

অলৌকিকভাবে পানির উৎস সৃষ্টি সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) উপস্থিত হন এবং মাটিতে আঘাত করেন। তখন সেখান থেকে পানির ঝর্ণা প্রবাহিত হতে শুরু করে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, শিশু ইসমাইল (আ.) পা দিয়ে মাটি আঘাত করছিলেন এবং সেখান থেকেই পানি বের হয়।

হাজেরা (আ.) পানি অপচয়ের আশঙ্কায় চারপাশে বালি ও পাথর দিয়ে বাঁধ দেন এবং বলতে থাকেন ‘জম জম’, অর্থাৎ ‘থামো থামো’ বা ‘প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করো’। ধারণা করা হয়, এখান থেকেই ‘জমজম’ নামের উৎপত্তি।

মক্কা নগরীর সূচনা জমজম কূপ সৃষ্টি হওয়ার পর সেখানে জুরহুম গোত্রের লোকেরা বসতি স্থাপন করে। ধীরে ধীরে মরুভূমির সেই এলাকা কাফেলাদের বিশ্রামস্থল ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে নবী ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেন।

বর্তমানে কাবা শরিফ অবস্থিত মসজিদুল হারাম-এর ভেতরে জমজম কূপ রয়েছে। কাবাঘরের পূর্বদিকে প্রায় ২০ মিটার দূরে এর অবস্থান।

ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, জমজম আল্লাহপ্রদত্ত বরকতময় পানি। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জমজমকে “পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পানি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, এই পানি পান করলে আল্লাহর রহমতে রোগ-ব্যাধি ও বিপদাপদ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়।

হজ ও ওমরাহ পালনকারীরা তাওয়াফের পর সুন্নত হিসেবে জমজমের পানি পান করেন। যদিও এটি হজের ফরজ বা ওয়াজিব অংশ নয়, তবে হজের ইতিহাসের সঙ্গে জমজম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

কূপটির বৈশিষ্ট্য: জমজম কূপকে বিশ্বের প্রাচীনতম কূপগুলোর একটি মনে করা হয়। প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে এখান থেকে অবিরাম পানি পাওয়া যাচ্ছে।

কূপটির কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য:

গভীরতা প্রায় ৩০ মিটার  প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৮.৫ লিটার পানি উত্তোলন সম্ভব  পানি নিয়মিত পরিশোধন ও জীবাণুমুক্ত করা হয়  মক্কা ও মদিনায় বিশেষ পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়  প্রতিদিন লক্ষাধিক হাজি ও মুসল্লি এই পানি পান করেন  সৌদি আরবের জিওলজিক্যাল সার্ভে পানির মান পরীক্ষা ও তদারকি করে।

ইসলামী ইতিহাস অনুযায়ী, একসময় জমজম কূপ বালু ও ময়লায় ঢেকে হারিয়ে যায়। পরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নের মাধ্যমে এর অবস্থান জানতে পারেন এবং পুনরায় কূপটি খনন করেন।

পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় সৌদি কর্তৃপক্ষ কূপটির সংস্কার ও আধুনিকায়ন করেছে। ২০১৩ সালে জমজম পানি উত্তোলন ও বিতরণের জন্য বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয় এবং ২০১৭ সালে ব্যাপক সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়।

জমজমের পানির মান ও গবেষণা: জমজমের পানি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা হয়েছে। কিছু বিতর্ক থাকলেও সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিয়মিত পরীক্ষায় পানি নিরাপদ ও বিশুদ্ধ প্রমাণিত হয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে:

পানিতে ক্ষতিকর জীবাণু নেই  রাসায়নিক উপাদান আন্তর্জাতিক মানের মধ্যে রয়েছে  এটি মানবদেহের জন্য নিরাপদ  লিভার ও শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয় 

তবে গবেষকরা আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন।

হজের সঙ্গে জমজমের সম্পর্ক: জমজম কূপ হজের ফরজ অংশ নয়। তবে হজের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাজেরা (আ.)-এর সাফা-মারওয়ার দৌড় স্মরণেই আজও হাজিরা সাঈ করেন। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জমজম কূপ।

মুসলমানদের কাছে তাই জমজম শুধু একটি কূপ নয়; এটি বিশ্বাস, ইতিহাস, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর রহমতের প্রতীক।

সূত্র: বিবিসি