সারা বাংলা

দেশের বিভিন্ন স্থানে উদযাপন হচ্ছে ঈদ

সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে মিল রেখে বুধবার (২৭ মে) ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন দেশের বিভিন্ন জেলার অনেক মানুষ। এর মধ্যে- দিনাজপুর, পটুয়াখালী ও চাঁদপুরের অনেক গ্রামে উৎসব মুখর পরিবেশে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম: দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়াসহ প্রায় ৬০টি গ্রামে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন কয়েক লাখ মানুষ। একদিন আগে ঈদ উদযাপন করছেন মির্জাখীল দরবার শরীফ ও জাহাঁগিরিয়া শাহসুফি মমতাজিয়া দরবার শরীফের অনুসারীরা। নামাজ শেষে পশু কোরবানিও শুরু হয়েছে।

ভোর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় ঈদের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। সকাল থেকে দরবার শরীফ ও সংশ্লিষ্ট ঈদগাহ ময়দানে ঈদের জামাতে অংশ নিতে ভিড় করেন মুসল্লিরা। 

চন্দনাইশের কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়নের জাহাঁগিরিয়া শাহসুফি মমতাজিয়া দরবার শরীফে পীর সৈয়্যদ মো. আলীর ইমামতিতে সকাল ৭টায় ঈদুল আজহার প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সাতকানিয়ার মির্জাখীল দরবার শরীফে সৈয়্যদ মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহমান শাহ জাহাঁগিরীর ইমামতিতে সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে এবং ড. সৈয়্যদ মাওলানা মুহাম্মদ মকছুদুর রহমান জাহাঁগিরীর ইমামতিতে সকাল সাড়ে ৮টায় পৃথক ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

দরবার শরীফ সূত্র জানায়, প্রায় ২০০ বছর আগে সুফি সাধক মাওলানা মোখলেসুর রহমান (র.) সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালনের যে নিয়ম চালু করেছিলেন, তার অনুসারীরাই এখনো সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন।

সাতকানিয়ার মির্জাখীল দরবার শরীফের সৈয়্যদ মাওলানা আবদুর রহমান শাহ জাহাঁগিরী এবং জাহাঁগিরিয়া শাহসুফি মমতাজিয়া দরবারের শাহজাদা মাওলানা মো. মতি মিয়া মনসুর জানান, হানাফি মাজহাবের অনুসারী হিসেবে সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের সঙ্গে মিল রেখে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন তারা। এটি তাদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ঐতিহ্য।

জানা গেছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও আনোয়ারাসহ বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৬০টি গ্রামে আজ ঈদ উদযাপন হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বাইনজুরি, কানাইমাদারি, সাতবাড়িয়া, বরকল, ধোপাছড়ি, দোহাজারি, পশ্চিম এলাহাবাদ, কেশুয়া, শ্রীমাই, গুনাগরি, কালিপুর, গন্ডামারা, সাধনপুর, চুনতি, পুটিবিলা, কাঞ্চনা, পুরানগড় ও মনেয়াবাদসহ আরো অনেক এলাকা।

এছাড়া, চট্টগ্রামের বাইরে কক্সবাজার, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়াতে ঈদ উদযাপন হচ্ছে বলে জানা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল ৯টায় ফতুল্লার লামাপাড়ায় হযরত শাহ সুফী মমতাজিয়া এতিমখানা ও হেফজখানা মাদ্রাসায় ‘জাহাগিরিয়া তরিকার’ অনুসারীরা ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজে ইমামতি করেন মুফতি মাওলানা শাহাবুদ্দিন। 

জামাতে অংশ নিতে গাজীপুরের টঙ্গী, ঢাকার কেরাণীগঞ্জ, পুরাতন ঢাকা, ডেমরা, সাভার এবং নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, বন্দর, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁ উপজেলা থেকে মুসল্লিরা অংশ নেন। 

এদিকে, সোনারগাঁ উপজেলার ২৩ গ্রামের মানুষ আজ ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন। উপজেলার বাংলাবাজার এলাকার গিরদাইন পশ্চিমপাড়া, নয়াপুর, গণকবাড়ী, গজারিয়াপাড়া, কোনাবাড়ী, মুসারচর, রতন মার্কেট ও হাতুরাপাড়াসহ ২৩ গ্রামের মুসল্লিরা ঈদ করছেন সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে।

আজ সকাল ৮টায় গিরদাইন পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদে প্রধান ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় নয়াপুর, গণকবাড়ী, গজারিয়াপাড়া, কোনাবাড়ী ও হাতুরাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পৃথক ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গিরদাইন পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আমজাদ বলেন, ‍“দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের এলাকার মানুষ সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও দুই ঈদ পালন করে আসছেন। এবারও শান্তিপূর্ণভাবে ঈদের জামাত শেষ হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকেও মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে এসেছিলেন। কাঁচপুর চেয়ারম্যানপাড়া এলাকা থেকেও অনেক মুসল্লি গিরদাইনে ঈদের নামাজ আদায় করতে আসেন।”

গিরদাইন পশ্চিমপাড়া গ্রামের জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা ওমর ফারুক বলেন, “আমরা প্রায় ২০ পরিবার প্রতি বছর সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদ উদযাপন করছি। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ঈদুল আজহা উদযাপন করছি।”

পটুয়াখালী: জেলার ৩৫ গ্রামের ৩০ হাজার মানুষ উদযাপন করছেন আগাম ঈদুল আজহা। বুধবার সকাল থেকেই পাড়া মহল্লায় বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। শিশু থেকে বয়স্করা একে অপরের সঙ্গে আলিঙ্গনের মাধ্যমে ভাগাভাগি করছেন ঈদ আনন্দ। 

সকাল ৭টা থেকে একের পর এক গ্রামে শুরু হয় ঈদের নামাজ। সকল ৮টায় জেলা সদর উপজেলার বদরপুর দরবার শরীফ জামে মসজিদ মাঠে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া, দ্বিতীয় বৃহত্তম জামাত অনুষ্ঠিত হয় কলাপাড়ার ধানখালী ইউনিয়নের উত্তর নিশানবাড়িয়া জাহাগিরিয়া শাহ্সূফি মমতাজিয়া দরবার শরীফ প্রাঙ্গনে। এই দুই দরবার শরীফে অনুষ্ঠিত নামাজে সবেচেয়ে বেশি মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন।

জেলা সদর উপজেলার আরো দুই গ্রাম, কলাপাড়ার সাতটি গ্রামে, রাঙ্গাবালির পাঁচটি গ্রাম, গলাচিপার পাঁচটি গ্রামে, দুমকির চারটি গ্রাম ও বাউফল উপজেলার ১০টি গ্রামে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

জানা গেছে, প্রায় ১৫০ বছর ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে আগাম ঈদ পালন করে আসছেন তারা। স্থানীয়ভাবে তারা চট্টগ্রামের এলাহাবাদ সুফিয়া ও চানটুপির অনুসারী হিসেবে পরিচিত। 

সদর উপজেলার বদরপুর দরবার শরীফ জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব আলহাজ্ব হজরত মাওলানা আবদুল সফিকুল ইসলাম গনি বলেন, “আমরা কোরআনের আলোকে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ উদযাপন করেছি। নামাজ শেষে দেশ ও বিশ্বের শান্তি কামনায় বিশেষ দোয়া মোনাজাত করেছি।” 

চাঁদপুর: চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলার ৪০টি গ্রামে ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে। বুধবার (২৭ মে) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঈদের প্রথম জামাত হাজীগঞ্জের সাদ্রা দরবার শরিফে অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন পীরজাদা আরিফ চৌধুরী সাদ্রাভী। দ্বিতীয় জামাত পরিচালনা করেন আবু ইয়াহিয়া জাকারিয়া মাদানী।

এছাড়া, এই উপজেলার সাদ্রা, সমেশপুর, অলিপুর, বলাখাল গ্রামে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি কচুয়া ও শাহরাস্তিসহ কয়েকটি উপজেলার অনেক গ্রামের বাসিন্দারা ধর্মীয় এ উৎসবে শামিল হয়েছেন।

হাজীগঞ্জের সাদ্রা দরবার শরিফের পিরজাদা আবু ইয়াহিয়া মো. জাকারিয়া আল মাদানি বলেন, “মরহুম মাওলানা ইসহাক ১৯২৮ সাল থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উদযাপনের নিয়ম চালু করেন। তারপর থেকে সেই ধারায় দেশের বিভিন্ন দরবার শরিফের পীরের অনুসারী এবং সচেতন মুসল্লিরা ঈদ পালন করছেন।”

দিনাজপুর: শহরের চারুবাবুর মোড়ের পার্টি সেন্টারে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মুসল্লিরা নামাজে অংশগ্রহণ করেন। জামাতে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্য নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল। জামাতে ইমামতি করেন দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী হলি কুরআন মাদরাসার পরিচালক ও নবাবগঞ্জ উপজেলার মোহাজেরপুর গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা মো. আব্দুর রাজ্জাক। 

এছাড়া,  চিরিরবন্দর, বিরল, কাহারোল, বিরামপুর ও হাকিমপুর উপজেলায় সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করেছেন কয়েক শ পরিবার।

দিনাজপুর জেলায় ২০০৭ সাল থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদের নামাজ পড়ার রীতি শুরু হয়। প্রথম দিকে মুসল্লির সংখ্যা কম থাকলেও প্রতি বছর তা বাড়ছে।