হজ ইসলামের ফরজ বিধান ও অন্যতম স্তম্ভ। সুস্থ ও সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে মানুষ! আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন। সুতরাং তোমরা হজ কোরো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৩৩৭)
হজের বিশেষত্ব হলো, এতে মুমিন আল্লাহর জন্য নিজেকে পরিপূর্ণরূপে সমর্পণ করে। হজ সম্পন্ন করতে মুমিনের আত্মা, শরীর ও অর্থ সবকিছু নিযুক্ত করতে হয়। হজে আল্লাহ অন্যসব ইবাদতের রুহ ও নির্যাস রেখেছেন। পবিত্র ভূমিতে পৌঁছে মুমিন আল্লাহর খলিল ইবরাহিম (আ.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে, সে আল্লাহর ভালোবাসায় নিমগ্ন হয় এবং নিজেকে আল্লাহর রঙে রঙিন করে তোলে।
তাত্ত্বিক আলেমরা বলেন, ইবরাহিম (আ.) কাবাঘর নির্মাণ করার পর মানবজাতিকে আহ্বান করেছিলেন, হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রভুর ঘরের হজ কোরো। আল্লাহ এই আহ্বান রুহের জগতে পৌঁছে দেন। তখন যারা ইবরাহিম (আ.)-এর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল তারাই হজের সৌভাগ্য লাভ করে থাকে। হাজিরা যে লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক (আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির) বলেন, সেটা মূলত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই আহ্বানেরই জবাব।
হজের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো বান্দার অন্তরে আল্লাহর স্মরণ এবং মহানবীর (সা.) ভালোবাসা জাগ্রত করা। হজের সফরে মুমিন পবিত্র কাবাঘর, সাফা-মারওয়া, জমজম কূপ, হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইবরাহিমের মতো আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে। এই সফরে মুমিনরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ভূমি মক্কা-মদিনা এবং তাঁর পবিত্র রওজা জিয়ারতের সুযোগ লাভ করে। ফলে আল্লাহপ্রেমী বান্দারা অন্তরে আল্লাহ ও রাসুলের সান্নিধ্যের সৌরভ অনুভব করতে পারে।
হজ হলো জগত সংসার ছেড়ে মহান স্রষ্টার দিকে যাত্রা করা। মুমিন তার সন্তান, পরিবার, ঘর-বাড়ি, মাতৃভূমি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব ছেড়ে মহান আল্লাহর সন্ধানে বের হয়। যদিও পার্থিব জীবনে বান্দার পক্ষে আল্লাহর সাক্ষাৎ সম্ভব নয়, তবুও আল্লাহর ঘর, জান্নাতি পাথর ও কুদরতের অসংখ্য নেয়ামত দেখে মন প্রশান্ত হয়। আল্লাহর প্রেমিকরা যখন পবিত্র কাবার সামনে দাঁড়ায় তখন তারা আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করে। এরপর সে যখন তাওয়াফ করে, তখন সে যেন আল্লাহকে ঘিরেই আবর্তিত হয়, আল্লাহপ্রেমে মাতওয়ারা হয়।
একাধিক আয়াত ও অসংখ্য হাদিস দ্বারা হজের মর্যাদা প্রমাণিত। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে বিরত থাকল, সে এমন অবস্থায় ফিরে আসবে যেমন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫২১)
অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৭৩)
হজ শুধু মুমিনকে পরকালেই উপকৃত করে না, বরং পার্থিব জীবনেও তা মানুষকে উপকৃত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা নিয়মিত হজ ও ওমরাহ কোরো। কেননা দারিদ্র্য ও পাপ দূর করে দেয়, যেভাবে রেত লোহার মরিচা দূর করে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৫৬৯৪)
ইসলামী শরিয়তের বিধান মতে, কোনো মুসলমান যখন সাবালক, সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন, স্বাধীন ও সামর্থ্যবান হয় তখন তার ওপর হজ ফরজ হয়। আর নারী হলে সঙ্গে পুরুষ মাহরাম থাকাও আবশ্যক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য এই ঘরের হজ করা ফরজ, যে সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯৭)
হজ ফরজ হওয়ার পর কোনো ব্যক্তির জন্য তা আদায়ে বিলম্ব করা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ্জের সংকল্প করে সে যেন অবিলম্বে তা আদায় করে। কারণ মানুষ কখনো অসুস্থ হয়ে যায়, কখনো প্রয়োজনীয় জিনিস বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং কখনো অপরিহার্য প্রয়োজন সামনে এসে যায়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৮৮৩)
সামর্থ্য থাকার পরও যারা হজ করে না ওমর (রা.) তাদেরকে অমুসলিমদের সঙ্গে তুলনা করেছেন (আল কাবায়ির)। মনে রাখতে হবে, হজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সুতরাং তা পূর্ণ নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে আদায় করা আবশ্যক। মুমিন জাগতিক খ্যাতি, সুনাম, সমাজ-রক্ষা, অর্থবিত্ত প্রদর্শনের জন্য সে হজ করবে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমার আল্লাহর জন্য হজ ও ওমরাহ কোরো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে প্রদর্শন ও সুনাম অর্জনের মানসিকতামুক্ত হজ করার তাওফিক দিন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮৯০)
যারা লোক দেখানোর জন্য হজ করে, পরকালে তাদের হজ নিষ্ফল বলে বিবেচিত হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যেদিন আল্লাহ তাআলা বান্দাদের আমলের প্রতিদান দেবেন, সেদিন লৌকিকতাকারীদের বলবেন, দুনিয়াতে যাদের দেখাতে আমল করতে, তাদের কাছে যাও। দেখো তাদের থেকে কোনো প্রতিদান পাও কি না।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২২৫২৮)
আল্লাহ সবাইকে কবুল হজের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : তরুণ আলেম ও মুহাদ্দিস