“দুপুর একটা থেকে নরসিংদী মনোহরদির গাড়ি খুঁজছি। যেখান থেকে গাড়ি সব সময় ছাড়ে সেখানে একটা গাড়িও নাই। পুরো বাস স্টেশন তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম, কোথাও গাড়ি নাই। অন্য বাসের লোকজন জানাল, বেশি ভাড়ায় ট্রিপ মারার জন্য ওরা বাস এখানে আনছে না। বরং গাড়ি স্টেশনের না এনে সায়েদাবাদের দূরে বাইরে রাস্তায় সুবিধাজনক জায়গা থেকে বেশি ভাড়ায় রিজার্ভ ট্রিপ মারছে। বিষয়টি বিআরটিএর ভিজিলেন্সটিমকে জানিয়েও তারা তাৎক্ষণিক কিছুই করতে পারেনি। ফলে, ঈদের একদিন আগে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মনোহরদি পরিবহন মালিক আমাদের মতো যাত্রী সাধারণকে জিম্মি করে রেখেছে। আমাদের ভোগান্তি হলেও তাদের কী?”
গাড়ি না পেয়ে নির্ধারিত সময়ে বাড়ি যেতে না পেরে এভাবেই ক্ষোভ ঝাড়লেন রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মজীবী মহিলা।
বুধবার (২৭ মে) বিকেলে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের বাড়ি ফেরার চিত্র এটি।
তিনি বলেন, “ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে দুপুর একটার দিকে বাস টার্মিনালে আসি। একটা গাড়িও নাই। যাব কীভাবে বলেন তো। পুলিশ ও বিআরটিএকে জানিয়েছি। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।”
শুধু কর্মজীবী ওই মহিলা নয়, বরং কুমিল্লা, ভৈরব, সিলেট, সুনামগঞ্জ, বাক্ষণবাড়ীয়া, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলার গণপরিবহনে বাড়ি ফেরা যাত্রী সাধারণের একই অবস্থা।
বিকেলে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, সায়েদাবাদে বিভিন্ন জেলার বাস একদম কম। কিছু কিছু জেলার বাস একদম নাই। আবার কিছু বাস টার্মিনালের ভেতরে রাখা হয়েছে। এসব রুটে যাত্রী বাস খুঁজলেও কৃত্রিম সংকট দেখানো হচ্ছে। যে কয়টা বাস টার্মিনালের মুখে নিয়ে আসা হচ্ছে প্রত্যেকটি রুটের বাস ভাড়া পঞ্চাশ থেকে একশ, দুশ, মাঝে মধ্যে তারচেয়েও বেশি নিতে দেখা গেছে।
যাত্রী সাধারণের অভিযোগ, ঈদের একদিন আগে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে যাত্রীর বেশি চাপ নেই। বাট যেসব যাত্রী আসছেন তারা গাড়ি পাচ্ছেন না। গণপরিবহন মালিকরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাস টার্মিনালে বাস আনছে না। ফলে, যাত্রী সাধারণ ভোগান্তিতে পড়েছেন। যে কয়টি গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে তাতেও পাশাপাশি বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাদের।
বিকেলে কথা হয়, আনিসুর রহমান নামের একজন কর্মজীবীর। তিনি পরিবার নিয়ে কুমিল্লা যাবেন। গাড়ি সংকটের মধ্যে অনেক ঘুরাঘুরি করে অবশেষে ঢাকা কোম্পানিগঞ্জ তিশা পরিবহনের গাড়ি ধরলেন। তার গাড়ি নম্বর ঢাকা মেট্টো–ব ১৫৩২৭১।
তিনি বলেন, “যাত্রীর চাপ নেই তবুও গাড়ি সংকট। সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে এই গাড়িতে কুমিল্লা যাচ্ছি। তিনশ টাকার ভাড়া এখন চারশ। উপায় নেই, যেকোনো মূল্যে বাড়ি যেতে হবে।”
এ সময় একজন যাত্রী জানান, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে ওপেন বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। কিছুই করার নেই যাত্রী সাধারণের। পুলিশ কিংবা বিআরটি এর ভিজিলেন্স টিমের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। তারা তাদের অস্থায়ী কক্ষে বসে বসে তামাশা দেখেন বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন ওই যাত্রী।
একই সময়ে গাড়ি সংকটে পড়ে বেশ কিছু যাত্রী ঢাকা কুমিল্লা তিশা পরিবহনের তিশা সুপার গুল্ডেন ঢাকা মেট্টো-ব ১৪-৮৪৫৮ নম্বর গাড়িতে উঠার জন্য হুড়োহুড়ি করেন। সুযোগ পেয়ে বাসের হেলপার যাত্রীদের কাছ থেকে চারশ টাকা নগদ নিয়ে একটা স্লিপ ধরিয়ে দিচ্ছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে বাসটি ভরে যায়। প্রত্যেকটি যাত্রীর কাছ থেকে চারশ টাকা করে নেওয়া হয়।
বেশি ভাড়া কেন নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে বাসটির হেলপার আরাফাত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “ঈদ উপলক্ষে আমরা আবদার করে বিশ পঞ্চাশ টাকা চেয়ে নিচ্ছি। জোর করে কারও কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে না। ঈদের আগের দিনও মোটামুটি যাত্রী রয়েছে। সায়েদাবাদের প্রবেশ পয়েন্টে যানজটের কারণে আমাদের সব গাড়ি ঠিক টাইমে বাস টার্মিনালে ঢুকতে পারছে না।” এ কারণে গাড়ি সংকট রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ সময় এক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“বাস হেলপালের বক্তব্য সঠিক নয়। বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ওরা জোর করেই বাড়তি টাকা নিচ্ছে। এমনিতে গাড়ি নেই। বাড়তি ভাড়াতে যেটা পাইছি, বাড়ি যেতে বাধ্য হয়ে সেটাই ধরেছি।”
এভাবে বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, সিলেট সুনামগঞ্জের ‘মিতালি পরিবহন’, সিলেটের ‘মা বাবা পরিবহন’, ‘জোনাকি পরিবহন’, এমনকি কাউন্টার কেন্দ্রীক ‘হানিফ পরিবহন’সহ প্রায় গাড়িতেই বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পুলিশ কন্ট্রোলরুমে যোগাযোগ করা হলে উপস্থিত ওয়ারী জোনের (পেট্টোল) সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল আলম খান বলেন, “বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ নেই। যাত্রী সাধারণ সচেতন হলে বাস মালিকরা বাড়তি ভাড়া নিতে সাহস করবে না। তারপরও কেউ বাড়তি ভাড়া নিতে চাইলে উক্ত পরিবহন মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
যাত্রী সাধারণ কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ করছেন এ বিষয়ে তিনি বলেন, “কিছু কিছু মালিক হয় তো এটা করছে। কারণ এখান থেকে গাড়ি ছাড়লে গলাকাটা ভাড়া নিতে পারবে না। তবে যানজটের কারণেও অনেক মালিক বাস টার্মিনালে না এনে গাড়ি অন্যত্র জায়গা থেকে গাড়ি ছাড়ছেন।”
কৃত্রিম গাড়ি সংকট ও বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে বাস টার্মিনালে বিআরটিএর ভিজিলেন্স টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এখানকার দায়িত্বরত বিএরআরটিএর সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, নরসিংদী মনোহরদী পরিবহনের গাড়ি সংকটের অভিযোগ সত্য। আমরা মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। কেন টার্মিনালে গাড়ি নেই, জানতে চাওয়া হয়েছে। যেসব পরিবহন মালিক কৃত্রিম গাড়ি সংকট সৃষ্টি করে যাত্রী সাধারণের ভোগান্তি সৃষ্টি করছেন এসব পরিবহনের রুট পারমিট বাতিলসহ মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বাড়তি ভাড়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, “কিছু কিছু পরিবহন ভাড়া বেশি নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাচ্ছি। তবে গাড়ি সংকটের এ সময়ে এ বিষয়ে বেশি কড়াকড়ি করলে এই মুহূর্তে গাড়ির সংকট আরো বাড়বে। তাতে আরো বেশি ভোগান্তি হবে যাত্রী সাধারণের।”
এদিকে, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে আগেভাগেই অনলাইনে টিকিট কিনে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে দুই জনকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে দেয় জনতা। পরে বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দুজনকে নগদ পাচ হাজার টাকা জরিমানা করে। লিটন নামের একজনকে ছেড়ে দিলেও অন্যজন এত টাকা দিতে না পারায় পুলিশের জিম্মায় রাখা হয়। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দুই হাজার টাকা জরিমানা আদায়ে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।