কোরবানির ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের এক মহিমান্বিত শিক্ষা। এ দিনের মূল কাহিনি জড়িয়ে আছে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অনন্য ত্যাগের সঙ্গে।
পবিত্র কোরআনের সুরা সাফফাতের (আয়াত: ১০০–১১১) বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা স্বপ্নের মাধ্যমে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে তার প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার নির্দেশ দেন। আল্লাহর আদেশ পালনে ইবরাহিম (আ.) দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। একইভাবে ইসমাইল (আ.)-ও আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ প্রকাশ করেন।
তাদের এ আনুগত্য ও ত্যাগের মহান দৃষ্টান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে আল্লাহ তাআলা ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানির জন্য পাঠান। সেই ঘটনার স্মরণেই মুসলমানরা প্রতি বছর ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি করেন।
এ শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত কোরবানি শুধু পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তু ত্যাগ করার মানসিক প্রস্তুতির নামই হলো প্রকৃত কোরবানি।
মহানবী (সা.)-এর কোরবানির আমল হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঈদুল আজহার দিনে দুটি দুম্বা কোরবানি করতেন। একটি নিজের পক্ষ থেকে এবং অন্যটি তাঁর সমগ্র উম্মতের পক্ষ থেকে। কোরবানির সময় তিনি বলতেন— “বিসমিল্লাহ, আল্লাহু আকবার।” এ আমলের মাধ্যমে তিনি উম্মতকে ত্যাগ ও সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানি করার শিক্ষা দিয়েছেন।
ঈদের নামাজ ও হারবা ইমাম বুখারি (রহ.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য মদিনার ঈদগাহে যেতেন। তার সামনে একটি ‘হারবা’ বা বর্শা স্থাপন করা হতো। এটি ছিল নামাজের সময় সুতরা হিসেবে ব্যবহৃত একটি প্রতীকী উপকরণ। পরবর্তীকালে খলিফাদের কাছেও এটি সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে।
সুন্দর পোশাক ও সুগন্ধি ব্যবহারের উৎসাহ মহানবী (সা.) ঈদের দিনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোশাক পরতে উৎসাহ দিতেন। তিনি সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং উম্মতকেও পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের প্রতি যত্নবান হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। ঈদকে তিনি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং সামাজিক সৌহার্দ্য ও আনন্দ ভাগাভাগির দিন হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ঈদের আনন্দে অংশগ্রহণ সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে, ঈদুল আজহার দিনে মদিনার কিছু মানুষ তাঁদের ঐতিহ্যবাহী তরবারি ও ঢাল নিয়ে খেলা প্রদর্শন করছিলেন। মহানবী (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-কে সেই খেলা দেখার অনুমতি দেন এবং তাঁর সঙ্গে দাঁড়িয়ে তা উপভোগ করেন।
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ইসলাম আনন্দ ও বিনোদনকে নিরুৎসাহিত করে না; বরং তা যেন শালীনতা ও সীমার মধ্যে থাকে, সে দিকেই গুরুত্ব দেয়।
ঈদুল আজহার দিনে মহানবী (সা.)-এর এসব আমল মুসলিমদের জন্য এক অনন্য আদর্শ। তাঁর জীবনাচরণ আমাদের শেখায়—ত্যাগ, পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যই ঈদের প্রকৃত শিক্ষা।