মতামত

কোরবানির মর্যাদা ও বিধান

কোরবানি ইসলামের একটি ঐতিহ্যবাহী ও পরিচায়ক ইবাদত। আদম (আ.) থেকে মুহাম্মদ (সা.) সব নবী ও রাসুলের শরিয়তে কোরবানির বিধান ছিল। বর্তমানে মুসলমানরা তাদের জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর মিল্লাত বা ধর্মাদর্শের অনুসরণে কোরবানি করে থাকে। নবী ইবরাহিম (আ.) প্রিয় সন্তান ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর নির্দেশে, ভালোবাসার নজরানা হিসেবে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ শিশু ইসমাইলের পরিবর্তে জান্নাত থেকে দুম্বা পাঠিয়ে দেন। সেই থেকে মিল্লাতে ইবরাহিমের অনুসারীরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করে আসছে। ঐতিহাসিকরা লেখেন, মহানবী (সা.)-এর সম্মানিত পিতা আবদুল্লাহর জীবন বিনিময় হিসেবে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব একশ উট কোরবানি করেছিলেন।

কোরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত

কোরবানি মুসলমানের জন্য একটি আবশ্যক ইবাদত। সামর্থবান ব্যক্তির জন্য কোরবানির দিনগুলোতে কোরবানি করা ওয়াজিব। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মুমিনদের কোরবানি করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘‘অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।’’ (সুরা কাউসার, আয়াত : ২)

অন্য আয়াতে এসেছে, ‘‘(হে রাসুল!) আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ আল্লাহ রাববুল আলামিনের জন্য উৎসর্গিত।’’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৬২)

কোরবানির মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর ভালোবাসা ও আনুগত্যে নিজের ভেতরের পশুত্ব কোরবানি করা। কোরবানি প্রবৃত্তির বিপরীতে আল্লাহর আনুগত্যের অনুপ্রেরণা এবং তাকওয়ার অনুশীলনও বটে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘কোরবানির জন্তুর গোশত অথবা রক্ত আল্লাহর কাছে কখনোই পৌঁছে না; তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে কোরবানি করতে উৎসাহিত করেছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোরবানির দিনের আমলগুলোর মধ্য থেকে পশু কোরবানি করার চেয়ে কোনো আমল আল্লাহ তাআলার কাছে অধিক প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন এই কোরবানিকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে তা কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টিচিত্তে কোরবানি কোরো। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৪৯৩)

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। মহানবী (সা.) এমন ব্যক্তির ব্যাপারে বলেছেন, ‘‘যার কোরবানির সামর্থ্য আছে তবুও সে কোরবানি করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস : ৭৬৩৯)

যাদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব

ফকিহ আলেমরা বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। শর্ত হলো, ব্যক্তি ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে।

কোরবানির নিসাব

নিসাব হলো স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন ভরি। টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হলো সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। সোনা, রূপা কিংবা নগদ অর্থ এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও ব্যক্তির ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। 

নিসাব হিসাব করার সময় নগদ অর্থ, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বর্তমানে বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র অন্তর্ভুক্ত হবে। কোরবানির নিসাব পূর্ণ বছর থাকা আবশ্যক নয়, বরং কোরবানির দিনগুলোতে, এমনকি ১২ তারিখ সূর্যাস্তের কিছু আগে নিসাব পূর্ণ হলেও কোরবানি করা ওয়াজিব হয়। (আল মুহিতুল বোরহানি : ৮/৪৫৫; ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া : ১৭/৪০৫)

পরিবারের কোরবানি

একান্নভুক্ত পরিবারের একাধিক ব্যক্তি সাবালক, সুস্থ ও নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলে তাদের প্রত্যেকের ওপর ভিন্ন ভিন্ন কোরবানি করা ওয়াজিব। নাবালেগ শিশু-কিশোর ও যারা সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, তারা নিসাবের মালিক হলেও তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। তবে তাদের অভিভাবকরা চাইলে তাদের পক্ষ থেকে কোরবানি করতে পারবে। (বাদায়িউস সানায়ি : ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার : ৬/৩১৬)

মুসাফির ও দরিদ্র ব্যক্তির কোরবানি

যে ব্যক্তি কোরবানির দিনগুলোতে মুসাফির অবস্থায় থাকবে (৪৮ মাইল দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়। নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই এমন দরিদ্র ব্যক্তির ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কোরবানির নিয়তে কোনো পশু কেনে তাহলে তার জন্য সেই পশু কোরবানি করা ওয়াজিব। (ফাতাওয়ায়ে কাজিখান : ৩/৩৪৪; বাদায়িউস সানায়ি : ৪/১৯৫) 

কোরবানির সময়

জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মোট তিন দিন কোরবানির সময়। তবে সবচেয়ে উত্তম হলো প্রথম দিন কোরবানি করা। এরপর দ্বিতীয় দিন এরপর তৃতীয় দিন। এই তিন তারিখের দিবাগত রাতেও কোরবানি করা জায়েজ। তবে দিনে কোরবানি করাই উত্তম। (মাজমাউজ জাওয়াইদ : ৪/২২; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০; কাজিখান : ৩/৩৪৫)

আরো পড়ুন: কোরবানির পশু জবাই ও গোশত বণ্টনের নিয়ম

লেখক : তরুণ আলেম ও মুহাদ্দিস