জাতীয়

সাইপ্রাসে এস আলমের সম্পত্তি জব্দ

এস আলম গ্রুপের কর্ণধার শিল্পপতি মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীনের মালিকানাধীন সাইপ্রাসের পারেকক্লিশিয়া এলাকার একটি সম্পত্তি করেছে সেদেশের কর্তৃপক্ষ।

এস আলমের বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের যে আদেশ দেশের আদালতে দেওয়া হয়েছিল, সে অনুযায়ী বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বতি আইনি প্রক্রিয়ায় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাইপ্রাসের আদালত রায় দেওয়ার পর এই সম্পত্তি জব্দ করা হলো।

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সাইপ্রাসের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম সাইপ্রাস মেইল এই খবর প্রকাশ করেছে। 

সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, গত ১৯ মে সাইপ্রাসের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং ইউনিট (মোকাস) আদালতে সেদেশে থাকা এস আলমের সম্পত্তি জব্দ করার আবেদন করা হয়। শুনানি গ্রহণ করে সাইপ্রাসের নিকোসিয়া জেলা আদালত পারেকক্লিশিয়ায় এস আলমের সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেন। 

ব্যাংক লুটপাট, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের একাধিক মামলায় এস আলম ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন আসামি। তাদের নামে সাইপ্রাসে ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে, যার তালিকা আদালতেও জমা দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সাইপ্রাস মেইল লিখেছে, তবে সাইফুল আলম তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সাইফুল আলম ২০১৬ সালে সাইপ্রাসের বহুল আলোচিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ প্রোগ্রামের আওতায় দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন। বর্তমানে যে সম্পত্তিটি জব্দের আওতায় এসেছে, সেটি পারেকক্লিশিয়ায় অবস্থিত একটি দোতলা বাড়ি।

সাইপ্রাস মেইল আদালতে জমা দেওয়া নথির বর্ণনা তুলে ধরে লিখেছে, বাংলাদেশি তদন্তকারীরা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এস আলম ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও নামে-বেনামে থাকা কোম্পানির নেটওয়ার্কভুক্ত সম্পত্তি নিয়ে তদন্ত করছেন। তদন্তে প্রতারণামূলক ঋণ গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থপাচারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার দাবি করা হচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশের একটি আদালত ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া প্রায় ৬ মিলিয়ন ইউরো সমপরিমাণ ঋণসংক্রান্ত মামলায় সাইফুল আলমসহ তার পরিবারের ১০ সদস্য ও সহযোগীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন।

বাংলাদেশি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঋণ ১৩৪টি বাস কেনার উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও বাসগুলো কখনো কেনা হয়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছিল। পরে এসব ঋণের বেশিরভাগ খেলাপিতে পরিণত হয়। 

তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এসব ঋণের অর্থ বিভিন্ন কোম্পানি ও আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে কিনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, এই ঘটনার সঙ্গে দেশ থেকে ৮ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগ জড়িত। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের ধারণা, তদন্তসংশ্লিষ্ট সম্পদের কিছু অংশ সাইপ্রাস ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে থাকতে পারে।

তদন্তের একটি অংশে সাইপ্রাসে নিবন্ধিত অ্যাকলার ইন্টারন্যাশনাল (ACLARE International) নামে একটি কোম্পানির বিষয়ও উঠে এসেছে। ২০১৬ সালে অ্যাকলার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড কিনে নেওয়ার পর সাইফুল আলম কোম্পানিটির মালিক হন।  বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে, তদন্তাধীন অর্থ স্থানান্তরে কোম্পানিটি ব্যবহার করা হয়েছে কিনা।

আদালতের নথিতে সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও জার্সিতে গড়ে তোলা এস আলমের বিভিন্ন কোম্পানি ও ট্রাস্টের নেটওয়ার্কের বিষয়ও উঠে এসেছে। তদন্তকারীরা এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো ও আর্থিক কার্যক্রম যাচাই করছেন।

আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠান কুইন এমানুয়েল (Quinn Emanuel)-এর মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে সাইফুল আলম দাবি করেছেন, তার সব বিনিয়োগ বৈধ বিদেশি উৎস থেকে এসেছে এবং তার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ অন্যায় ও ভিত্তিহীন।

তিনি আরো দাবি করেছেন, সম্পদ জব্দের মতো পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্রে (আইসিএসআইডি) মামলা করেছেন তিনি।

সাইপ্রাস সরকার ইতোমধ্যে বিতর্কিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচি বাতিল করেছে। তবে এই কর্মসূচি নিয়ে তদন্তকারী নিকোলাটোস কমিটির প্রতিবেদনে সাইফুল আলমের নাম পাওয়া যায়নি।