আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করল জাতিসংঘ

সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করেছে জাতিসংঘ। এর প্রতিবাদে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। 

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর আল-জাজিরার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন বলেন, “এই মহাসচিবের সঙ্গে আমাদের সব সম্পর্ক শেষ।”

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘের বার্ষিক প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে পাঠানো হয়। এর আগে গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘ সতর্ক করেছিল যে, ইসরায়েলকেও এই তালিকায় রাখা হতে পারে।

জাতিসংঘের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানন বলেন, “যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে আমাদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ব্যবহারের অভিযোগ ও কালো তালিকাভুক্ত করার এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জঘন্য। জাতিসংঘ মহাসচিব ও তার দল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যা ছড়াচ্ছেন। হামাস সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আমাদের একই তালিকায় রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

জাতিসংঘে ইসরায়েলি মিশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আন্তোনিও গুতেরেস যতদিন জাতিসংঘের শীর্ষ পদে থাকবেন, ততদিন তার কার্যালয়ের সঙ্গে ইসরায়েল কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখবে না।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেণ মারমরস্টেইনও জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও লজ্জাজনক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

অন্যদিকে, জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক জানিয়েছেন, ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য সম্পর্কে তারা অবগত, তবে আলোচনার জন্য মহাসচিবের দরজা সব সময়ই উন্মুক্ত রয়েছে।

এদিকে, নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত রিম আলসালেম এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “ইসরায়েলকে কালো তালিকাভুক্ত করার এই সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল।”

তিনি আরো বলেন, “ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর পদ্ধতিগত ও ভয়াবহ যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলো স্বাধীনভাবে নথিবদ্ধ ও প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও কেন আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে আমি অতীতেও হতাশা প্রকাশ করেছিলাম।”

জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, ইসরায়েলি কারাগার ও আটক কেন্দ্রগুলোতে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর যৌন সহিংসতা চালানোর ‘নির্ভরযোগ্য প্রমাণ’ পাওয়া গেছে। যদিও ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা জাতিসংঘকে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখার আমন্ত্রণ জানালেও সংস্থাটি পরিদর্শনে যায়নি।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের পর আটক হওয়া ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি রক্ষীদের হাতে অমানবিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছেন। এছাড়া, সম্প্রতি গাজাগামী আন্তর্জাতিক ত্রাণবাহী জাহাজের মুক্ত হওয়া অধিকারকর্মীরাও ইসরায়েলি হেফাজতে থাকার সময় অন্তত ১৫টি পৃথক যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রখ্যাত সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টফের ১৪ জন ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীর ওপর করা এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। তবে ইসরায়েল সরকার এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের চালানো সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নৃশংসতার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের ক্রমাগত নিন্দার কারণে দুই পক্ষের সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এর আগে ২০২৪ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে ইসরায়েলে ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছিল তেল আবিব।