বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঈদের দিন বিকেল। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে। গ্রামের রাস্তাগুলোতে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে; তাদের কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে যাচ্ছেন, কেউ ফিরছেন দাওয়াত খেয়ে। এরই মধ্যে গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া গ্রামে চোখে পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য।
গ্রামের ঈদগাহ মাঠজুড়ে তখন কোলাহল। গ্রামের যারা কোরবানি দিয়েছেন তাদের পশুর মাংসের একটি অংশ এখানে বন্টণের কাজ চলছিল। সেই কাজে কেউ ওজন মাপছিলেন, কেউ মাংসের প্যাকেট সাজাচ্ছিলেন। ছোট ছেলেরা দৌড়ে দৌড়ে টোকেন মিলিয়ে দিচ্ছিল। মাঝেমধ্যে মাইকে ভেসে আসে নাম ডাকার শব্দ।
স্থানীয়দের দাবি, গ্রামের যেসব পরিবার কোরবানি দেন, তারা নিজেদের পশুর মাংসের একটি অংশ জমা করেন সম্মিলিত তহবিলে। পরে সেই মাংস সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয় সে সমস্ত পরিবারকে যারা কোরবানি দিতে পারেননি। সেখানে ধনী-গরিবের আলাদা হিসাব নেই, নেই সামাজিক মর্যাদার কোনো দেয়াল। সবার ভাগে পড়ে সমান আনন্দ।
মদিনাতুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ইনজামুল হক জাকির জানান, গ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কোরবানির মাংসের একটি অংশ সামাজিক বণ্টনের জন্য জমা দেন। এরপর মসজিদের আওতাভুক্ত যেসব পরিবার কোরবানি দিতে পারেননি, তাদের ঘরেও পৌঁছে যায় সেই মাংস।
জানা গেছে, ঈদের আগের রাত থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। গ্রামের তরুণরা হাতে তালিকা নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে টোকেন পৌঁছে দেন। কার পরিবারে কতজন সদস্য, কে কোরবানি দিয়েছেন, কে দেননি- সবকিছু হিসাব করে তৈরি হয় বণ্টনের পরিকল্পনা।
এলাকাবাসী জানান, ঈদের দিন দুপুরের পর থেকেই মানুষ জড়ো হতে থাকেন ঈদগাহ মাঠে। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একদল তরুণ নিজেদের উৎসব ভুলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অন্যের আনন্দ নিশ্চিত করতে। তেমনই একজন রাকিবুল হাসান শিশির। বন্ধুদের নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেছেন তিনি। কখনো মাংস কেটছেন, কখনো ওজন মেপেছেন, আবার কখনো ভাগ সাজিয়ে দিয়েছেন।
এই যুবক হাসতে হাসতে বলেন, “ছোটবেলায় দেখতাম আমাদের বড়রা এই কাজ করতেন। এখন আমরা করছি। আসলে এটা শুধু মাংস ভাগ করার বিষয় না- এই একটা দিনে পুরো গ্রাম এক হয়ে যায়।”
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মো. নূর আলম সরকারের কণ্ঠে মিশে ছিল কিছুটা আবেগও। তিনি বলেন, “আগে মানুষ একসঙ্গে থাকত, যৌথ পরিবার ছিল। এখন জীবন বদলেছে। এই আয়োজনটা এখনো মানুষকে কাছাকাছি রাখে। আমরা এই আয়োজন বাঁচিয়ে রাখতে চাই।”
আয়োজকদের তথ্যমতে, এ বছর প্রায় ৩০০টি মাংসের ভাগ তৈরি করা হয়েছে। শুধু সাধারণ পরিবারই নয়, গ্রামের বিধবা, প্রতিবন্ধী ও অসচ্ছল মানুষের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা বরাদ্দও। বিকেলের আগেই মসজিদের মাইকিংয়ের মাধ্যমে সবাইকে ডেকে এনে সম্পন্ন করা হয় পুরো বণ্টন কার্যক্রম।
ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি রফিজ উদ্দিন বলছিলেন বলেন, “এই রীতি আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া। একসময় আমাদের বাবারা করেছেন, পরে আমরা করেছি, এখন তরুণরা করছে। এভাবেই একটা প্রজন্ম আরেক প্রজন্মকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছে।”
তার মতে, “এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো- ঈদের দিনে গ্রামের কোনো পরিবার যেন মাংস ছাড়া না থাকে।”
একই কথা বললেন মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতী আরিফুল ইসলামও। তিনি মনে করেন, এই আয়োজন ইসলামের সাম্যের সৌন্দর্যকে বাস্তবে তুলে ধরে।
তার ভাষায়, “এখানে কেউ বড় না, কেউ ছোট না; সবাই সমান। অসহায় মানুষের কথাও আলাদা করে ভাবা হয়। এটাই তো প্রকৃত ঈদের শিক্ষা।”
সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে গ্রামের চেহারা। টিনের ঘরের জায়গায় উঠেছে পাকা বাড়ি, মাঠের জায়গায় হয়েছে নতুন রাস্তা। বদলেছে মানুষের জীবনযাপনও। কিন্তু এত কিছুর পরও ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়ার মানুষ ধরে রেখেছেন এক অনন্য মানবিক ঐতিহ্য।যেখানে কোরবানির মাংস শুধু প্লেটে ওঠে না- ভাগ হয়ে যায় মানুষের হৃদয়েও। ঈদের আনন্দ আটকে থাকে না কোনো একক পরিবারের দেয়ালের ভেতর, ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামজুড়ে।