স্বপনের সব ক্ষমতার উৎস তার এমপি মামা। এমপি মামাকে আমরা কখনো দেখি নাই। স্বপন নিজেও তাকে দেখেছে কিনা সন্দেহ, কিন্তু কিছু হলেই সে তার এমপি মামার গল্প দেয়। পাড়ার ছিঁচকে মাস্তান চাঁদা চাইতে এলে সে গলা উঁচিয়ে বলে, ‘দাঁড়াও, আমার এমপি মামাকে খবর দিতাছি , চাঁদা তোমার পুটকি দিয়া ঢুকায়া দিবে...।’ মাস্তান মুখ কাঁচুমাচু করে বলে, ‘ওই মিয়া, আগে কইবেন না, আপনে এমপি মামুর ভাইগনা, এই কথা জানলে কী আর আপনের কাছে আসি নিকি!’
স্বপনের কাছ থেকে শুনে শুনে আমরা এমপি মামার একটা ছবি তৈরি করেছি। ছবিটা এই রকম। অ্যায়সা লম্বা ছয় ফুটের কাছাকাছি একজন মানুষ। তার পাকানো পেশীবহুল শক্তপোক্ত শরীর। মাথায় ছোট ছোট কদম ছাটের চুল, নাকের নিচে বিশাল একটা কালো বিছার মতো তেল চকচকে গোঁফ। পরনে দামী হাওয়াই শার্ট; গ্যাবার্ডিনের প্যান্টে ইন করে পরা। কঠিন শক্ত চেহারা, রোদে পোড়া তামাটে গায়ের রং, তীব্র তীক্ষ্ম চোখের দৃষ্টি কিন্তু ঠোঁটের কোণায় একটা মৃদু স্নেহময় হাসি।
আমাদের পাড়ার ‘আল্লাহর দান মায়ের দোয়া গোস্ত বিতানে’র মালিক এমদাদ কসাই এক লোকের কাছে চল্লিশ হাজার টাকা পাইতো। লোকটা আজ দেই, কাল দেই করে ঘুরাইতেছিল। এমদাদ আইসা ধরলো স্বপনরে, ‘ভাই আপনের এমপি মামারে বইলা আমার টেকাটা উদ্ধার কইরা দেন। লাগলে কিছু খাইখরচ দিমুনে, হালায় আমারে এমুন দিগদারির মইধ্যে ফালাইছে।’ স্বপন একটু বিরক্ত হয়। ‘দূর মিয়া সব কিছুতে এমপি মামারে টানেন ক্যান? তার কি আর কাজকর্ম নাই? তার পার্লামেন্ট আছে। বাজেট সেশন আছে। বিদেশি মেহমানদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত আছে।’ এমদাদ তবু ছাড়ে না। তার কাকুতি মিনতিতে আমরাও স্বপনরে তদবির করি। ‘আরে ব্যাটা, চল না, মানুষটার যদি উপকার হয়, আল্লাহতালা খুশি হবে।’
শেষমেষ আমাদের মুলামুলিতে স্বপন রাজি হয়। এমদাদের টাকা মেরে দেওয়া লোকটার নাম কলিম উদ্দিন। সে মুদি দোকানদার। এমদাদ কসাইয়ের চাপাচাপিতে আমরা একদিন গেলাম কলিম উদ্দিনের দোকানে। স্বপন খাণিকক্ষণ এক দৃষ্টিতে কলিম উদ্দিনের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকল। তারপর ঠান্ডা শীতল গলায় বললো, ‘বেশি কিছু না কলিম, এমপি মামা তোমার হোগার মধ্যে তার পিস্তলের নলটা আস্তে কইরা ঢুকাইবো, তারপর আরো আস্তে ট্রিগারে একটা টিপ দিবো, বুলেটটা একটা ধাক্কা দিয়া তোমার মাথার খুলি ছিদ্র কইরা উপ্রে দিয়া বাইর হইয়া যাইব। আর কিছু না।’ কলিম উদ্দিন ডরে কাঁপতে কাঁপতে কয়, ‘ভাই, ঠান্ডা গরম কি খাইবেন কন।’ আমরা কই, ‘কিচ্ছু খামু না, তুমি তাড়াতাড়ি এমদাদের টেকা ফেরত দেও।’
ঘটনার তিনদিনের মধ্যে কলিম এমদাদের পুরা টাকা পাইপাই ফিরত দিলে অদেখা এমপি মামার কেরামতি আরো বাড়ে। পাড়ায় স্বপনের কদরও বেড়ে যায়। পাড়ার মুরুব্বীরা স্বপনকে দেখলে খামাকাই প্রশ্রয়ের হাসি হাসে। স্কুল কলেজের মেয়েরা প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় আড়চোখে স্বপনকে দেখে। শুধু মির্জা বাড়ির মেয়ে সুন্দরী মদিনা স্বপনকে একটুও পাত্তা দেয় না। মদিনা তার নাম সংক্ষিপ্ত করে নিজেই রেখেছে ‘দিনা’। দিনা আকতার। স্বপনের যেমন আছে এমপি মামা, মদিনার তেমনি আছে চেয়ারম্যান খালাম্মা। কথিত আছে, এই চেয়ারম্যান খালাম্মা নাকি খুবই দাপুটে, ড্যাম কেয়ার টাইপের নারী, তার এলাকায় যখন রাস্তাঘাটের উন্নয়ন কাজ চলে, তখন তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করেন, যাতে কন্ট্রাকটর ভেজাল দিতে না পারে। একবার কি হলো, রাতারাতি এক কন্ট্রাকটর রাস্তা বানিয়ে বিল সাবমিট করে খালাস। সকাল বেলা খালাম্মা এসে ধরলো কন্ট্রাকটরকে, বললো, ‘রাস্তা খুঁড়ো, আমি দেখতে চাই আসলে কয় ইঞ্চি ঢালাই হয়েছে।’
কন্ট্রাকটরের তো আক্কেলগুড়ুম। ‘নতুন রাস্তা খোঁড়াখুড়ি করবেন ম্যাডাম, ব্যাপারটা কি ভালো হবে?’ খালাম্মা বললেন, ‘ভালো-মন্দ আমি দেখবো, তাড়াতাড়ি শাবল আনো, রাস্তা খুঁড়ে দেখাও, ঠিকমতো কাজ করছো কিনা?’ শেষমেশ খোঁড়া রাস্তা পরীক্ষা করে দেখা গেল ঢালাই দেয়ার কথা ছিল পাঁচ ইঞ্চি, সেইটা দেয়া হয়েছে দুই ইঞ্চি। নগদে কন্ট্রাকটরের চোরামি ধরা পড়লো। তখন সবার সামনে, কোমরে শাড়ির আঁচল গুজে প্রকাশ্য দিবালোকে চিৎকার করে বিশ্রি ভাষায় কন্ট্রাকটরকে গালিগালাজ করলেন চেয়ারম্যান খালাম্মা। ব্যাস, চারিদিকে কথা রটে গেল— চেয়ারম্যান খালাম্মার এলাকায় কোনো কাজে তেড়িবেড়ি করলে খবর আছে। তবে দুষ্ট লোকে বলে, চান্স পাইলে গোপনে চেয়ারম্যান খালাম্মাও নামে-বেনামে কিছু দুর্নীতি করেন, আসলে খালাম্মা করেন না, তার একজন পিএস আছে, নাম জাহাঙ্গীর, সেই নাকি খালাম্মার নামে টেকাপয়সা এদিক-ওদিক করে।
স্বপনের এমপি মামার মতো মদিনার চেয়ারম্যান খালাম্মাকেও আমরা কোনো দিন নিজের চোখে দেখি নাই। তবে তাদের অনেক গল্প শুনেছি, গল্প শুনেই তাদের আমরা অল্পঅল্প চিনতে পেরেছি। স্বপন একটা কুকুর পোষে, কুকুরের নাম কামান আর মদিনা পোষে একটা বিড়াল, বিড়ালের নাম পিপুলি। প্রতিদিন বিকালে স্বপন যখন কামানকে নিয়া গলির মধ্যে হাঁটাচলা করে, মদিনা তখন ছাদের রেলিংয়ের পাশে দাঁড়ায়া পিপুলিকে কোলে নিয়া আদর করে, পিপুলি তখন আরামে চোখ বন্ধ করে মিঁউমিঁউ করতে থাকে। স্বপন দু’য়েকবার যে আকাশ দেখার ছলে ছাদের দিকে চকিতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তা আমরা টের পাই, আর মদিনার হরিণী মার্কা চোখের দৃষ্টিও যে রেলিংয়ে ঝুঁকে পড়ে, নিচের গলিতে শুধুই ফুচকাঅলাকে খোঁজে না, তা বুঝতে বড় কোনো ডিগ্রিধারী না হলেও চলে।
আমরা ভাবি, স্বপন আর মদিনার বিয়ে হলে কেমন হয়? দুটিতে মানাবে ভালো। তাছাড়া দুজনেরই দুজনের প্রতি চোরা আগ্রহ আছে। কিন্তু যেই না আমরা এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলাম, মদিনা ঘাড় বেঁকিয়ে বললো, ‘এতো ভাব ক্যান? স্বপনের মামা না হয় এমপি, স্বপন নিজে কী? আছে তার কোনো নিজস্ব পরিচয়? ডিগ্রি বা ব্যবসা?’ স্বপনেরও একই কথা, ‘এতো দেমাগ কিসের? খালা না হয় বুঝলাম চেয়ারম্যান, কিন্তু ভাগ্নি কী? মেম্বার না প্রশাসক?’
আমরা অবস্থা বেগতিক দেখে পাড়ার মসজিদের হুজুর চাচার কাছে গেলাম। তিনি আলেম ওলামা মানুষ, বুদ্ধি আছে, তিনি নিশ্চয়ই একটা পথ বাতলাবেন। হুজুর সব শুনে একটা আলোচনা সভার আয়োজন করতে বললেন, যেখানে এমপি মামা, চেয়ারম্যান খালাম্মা, হুজুর চাচা এবং মদিনা ও স্বপন উপস্থিত থাকবে।
এমপি মামাকে সেবারই আমরা প্রথম দেখলাম, তিনি ছোটখাটো, ক্লিন শেভড মানুষ, মাথায় অল্প চুল, পরনে সুতি কাপড়ের পাজামা পাঞ্জাবি, শুধু চোখের কোণায় একটা কঠিন ক্রর ভঙ্গী না থাকলে দেখতে একদম সাধারণ মানুষের মতোই। চেয়ারম্যান খালাম্মা এসেছেন হালকা হলুদ রঙের একটা জামদানি পরে, ফর্সা, মোটাসোটা মানুষ, আসামি মদিনা আর স্বপনও উপস্থিত।
হুজুর চাচাই ফ্লোর নিলেন প্রথমে, বংশ পরম্পরায় মানবজন্মকে টিকিয়ে রাখার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে বিবাহ বন্ধনকে বৈধ করেছেন সে ব্যাপারে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন তিনি। এমপি মামা দুম করে পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে স্বপনের দিকে তাক করলেন, ‘ব্যাটা, পছন্দ হইলে বিয়া করতে দেরী কেন? বেশি কথার দরকার নাই, তাড়াতাড়ি বল, ইয়েস অর নট?’
স্বপন কিছু বলার আগেই চেয়ারম্যান খালাম্মা দুই হাত মেলে পিস্তলের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। ‘আরে করেন কি, করেন কি? বন্দুকের নল না, আমাদের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি চর্চা করা উচিত। শান্তিপূর্ণ ভাবে পারস্পরিক মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সন্ত্রাস, সহিংসতা আমার মোটেও পছন্দ না। বলো দিনা মা, তুমি কি রাজি?’ স্বপন বললো, ‘খালাম্মা বিষয়টা এত সহজ না, আমাদের ভাবনা-চিন্তা করে সমাধানে আসতে হবে।’ মদিনাও বললো সিদ্ধান্ত নিতে তার সময় লাগবে। এমপি মামা পিস্তলটা পকেটে ঢুকিয়ে বললেন, ‘সমস্যা নাই। তোমরা আলোচনা করো। আর চেয়ারম্যান মহোদয়া যদি রাজি থাকেন তাহলে আমরা একসঙ্গে বসে কফি পান করতে পারি।’
চেয়ারম্যান খালাম্মা আর এমপি মামা কফি পান করতে চলে গেলেন। স্বপন আর মদিনাও বসলো আলোচনার টেবিলে। হুজুর চাচা দেখি উসখুশ করে। বলে, ‘আমার আর কাজ কী? আমি যাইগা।’ আমরা বলি, ‘আরে চাচা, কন কী? আপনেই তো আসল, আপনে না থাকলে বিয়া পড়াবে কে? যা হবার আজকেই হবে।’ ‘মনু তোমাগো অল্প বয়স, তোমরা জানো না, এইসব আলাপের সিদ্ধান্ত সহজে হয় না, দিনের পর দিন সংলাপ চলতেই থাকে, সংলাপ একটি চলমান প্রক্রিয়া, এর শুরু আছে, শেষ নাই।’
আমরা তবু হতাশ হই না। একটা ফলাফল না নিয়ে আমরা ফিরবো না। যত সময়ই লাগুক। আমাদের পীড়াপীড়িতে হুজুর চাচাও থেকে যান। আসর, মাগরেব, এশা তিন ওয়াক্তের নামাজও আমাদের এনে দেওয়া জায়নামাজে বসে আদায় করেন তিনি। আলোচনা চলতে থাকে। এমপি মামা ও চেয়ারম্যান খালাম্মা। মদিনা ও স্বপন। স্বপন ও চেয়ারম্যান খালাম্মা। এমপি মামা ও মদিনা। কখনো সম্মিলিত, কখনো দ্বিপাক্ষিক, কখনো ত্রিপক্ষীয়। মাঝে মাঝে হুজুর চাচাও যোগ দিচ্ছেন সেই আলোচনায়। সিদ্ধান্ত একটা আসবেই, আমরা আশা ছাড়ি না। টিভি চ্যানেলগুলোতে লাইভ সম্প্রচার শুরু হয়ে গেছে। ক্যামেরা, রিপোর্টার, ক্যামেরাপারসন হুলুস্থুল অবস্থা। টকশোগুলোতে আলোচনা সভার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ চলছে। সকলেই উদগ্রীব ফলাফল জানতে।
শেষ পর্যন্ত আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মাইকের সামনে সার বেঁধে দাঁড়িয়েছেন এমপি মামা, চেয়ারম্যান খালাম্মা, স্বপন, মদিনা আর হুজুর চাচা। এমপি মামাই কথা শুরু করলেন। ‘প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু অলাইকুম। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আপনাদের সামনে আমরা একটা সিদ্ধান্ত তুলে ধরছি। আপনারা জানেন, আমি বিপত্নীক, পাঁচ বছর আগে আমার স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে। এই অবস্থায় অনেক আলোচনার পর আমি ও দিনা বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ হুজুর চাচা সবার আগে বলে উঠলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ্, শুভ কাজে দেরী কেন?’
আমাদের আক্কেলগুড়ুম। চাইলাম কি আর পাইলাম কি? দিনা যদি এমপি মামাকে বিয়া করে স্বপনের কী হবে? তার তো দিনাকে মামি ডাকতে হবে। জনতার মধ্যে হঠাৎ মৃদু গুঞ্জন শুরু হলে এমপি মামা পিস্তল বের করে কয়েকটা ফাঁকা গুলি করতেই সব গুঞ্জন থেমে যায়। আমরা বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।