পবিত্র ঈদুল আজহা পরবর্তী কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ায় জমজমাট হয়ে উঠেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার মোকাম নাটোরের চকবৈদ্যনাথ। ঈদের দিন বিকেল থেকেই নাটোরসহ রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা এবং উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও পাইকাররা চামড়া নিয়ে আড়তগুলোতে আসতে শুরু করেছেন। বর্তমানে আড়তদার, ব্যাপারি ও শ্রমিকদের হাঁকডাকে মুখরিত পুরো এলাকা।
এদিকে, চামড়ার ব্যাপক আমদানি থাকলেও ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে থাকা কোটি কোটি টাকার বকেয়া এবং বাজারে লবণের চড়া দামের কারণে চাপা উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাঝে।
আড়তগুলোতে ২৪ ঘণ্টার ব্যস্ততা, পচন রোধে দ্রুত লবণজাতকরণ সরেজমিনে নাটোরের চকবৈদ্যনাথ চামড়ার বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি ট্রাক, নসিমন, করিমন, ভ্যান ও ট্রলি চামড়া নিয়ে আড়তের সামনে ভিড় করছে। ঈদের পরদিন শুক্রবার (২৯ মে) সকাল থেকে এই ভিড় আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তীব্র গরম ও তাপদাহের কারণে চামড়া যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য আড়তে পৌঁছানোর ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মধ্যেই তা প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ চলছে। আড়তগুলোতে এখন দম ফেলার ফুসরত নেই শ্রমিকদের। কেউ চামড়া থেকে রক্ত-ময়লা পরিষ্কার করছেন, কেউ চামড়া কাটছেন, আবার কেউ লবণ ছিটানোর কাজে ব্যস্ত।
ব্যবসায়ীরা জানান, কাঁচা চামড়া একটি পচনশীল ও সংবেদনশীল পণ্য। গরমের কারণে চামড়া দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই আড়তে চামড়া নামানোর সাথে সাথেই লবণ দেওয়ার কাজটি সম্পন্ন করা হচ্ছে, যাতে চামড়ার গুণগত মান ঠিক থাকে এবং ট্যানারি মালিকরা ভালো মানের চামড়া পান।
চামড়ার দাম ও বাজার পরিস্থিতি সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কেনাবেচার কথা বলা হলেও বাজারে চামড়ার আকার ও গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারিত হচ্ছে। বড় আকারের ভালো মানের গরুর চামড়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। মাঝারি ও ছোট আকারের চামড়ার দাম ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। অন্যদিকে, ছাগলের চামড়ার বাজার বরাবরের মতোই মন্দা। প্রতি পিস ছাগলের চামড়া মাত্র ১০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা গেছে।
সংরক্ষণের জন্য চামড়ায় লবণ দিচ্ছেন শ্রমিকরা
নাটোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাধারণ নাসির উদ্দিন খান বলেন, “ঈদের দিন বিকেল থেকেই আমাদের চকবৈদ্যনাথ মোকামে চামড়া আসা শুরু হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহ আমদানি অব্যাহত থাকবে। এবার চামড়ার গুণগত মান বেশ ভালো। আমাদের প্রধান সমস্যা হলো পুঁজির সংকট। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে নাটোরের ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। প্রতি বছর তারা নামমাত্র কিছু টাকা পরিশোধ করে নতুন চামড়া নেয়। এবারো তারা বকেয়া পুরোপুরি পরিশোধ করেনি। ফলে অনেক আড়তদার চাহিদামতো চামড়া কিনতে পারছেন না।”
চকবৈদ্যনাথের প্রবীণ আড়তদার হাজী মোছাদ্দেক আলী বলেন, “চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপাদান হলো লবণ। অথচ ঈদের সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেট করে লবণের দাম বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চামড়া কেনার চেয়ে এখন তা সংরক্ষণ করতেই বেশি খরচ হচ্ছে। যদি ট্যানারি মালিকরা সময়মতো আমাদের পাওনা টাকা না দেন এবং চামড়া না কেনেন, তবে নাটোরের অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে যাবেন।”
মৌসুমি ব্যবসায়ীর হতাশা সিংড়া উপজেলা থেকে চামড়া বিক্রি করতে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ী আনিসুল হক বলেন, “গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে অনেক কষ্ট করে চামড়া সংগ্রহ করেছি। গ্রামে গরুর চামড়া কিনতে হয়েছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। এখানে এনে লেবার খরচ আর গাড়ি ভাড়ার পর যে দাম পাচ্ছি, তাতে লাভ তো দূরের কথা, আসল টাকাই উঠবে কি না সন্দেহ। ছাগলের চামড়া তো কেউ দামই দিতে চায় না।"
নাটোরের চামড়া ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের এই অন্যতম বৃহৎ মোকামে এবার প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ পিস চামড়া কেনাবেচার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের চামড়া শিল্পের চাহিদার একটি বড় অংশ এখান থেকে সরবরাহ করা হয়।
নাটোর চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাইদ রহমান বলেন, “লবণের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং ট্যানারি মালিকদের বকেয়া টাকা পরিশোধ না করার সংস্কৃতি আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। কাঁচা চামড়া বেশিদিন ধরে রাখা যায় না। সরকারিভাবে দাম নির্ধারণ করা হলেও লবণের বাড়তি খরচের কারণে সেই দামে চামড়া কিনে আমাদের টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ছে। আমরা বকেয়া টাকা আদায় এবং লবণের বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিসিকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
যা বলছে প্রশাসন
নাটোর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, “কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে যাতে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি, বিশৃঙ্খলা বা সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য তৈরি না হতে পারে, সেজন্য আমরা চকবৈদ্যনাথ এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। চামড়াবাহী যানবাহন যাতে নির্বিঘ্নে মোকামে পৌঁছাতে পারে এবং কোনো অবস্থাতেই যেন সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচার না হতে পারে, সেজন্য জেলা পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কঠোর নজরদারি ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।”
নাটোর জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, “চকবৈদ্যনাথ চামড়ার মোকামে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসনের একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে কাজ করছে। চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপাদান লবণের কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কেউ যাতে অতিরিক্ত দাম ও মুনাফা লুটতে না পারে, সেজন্য আমরা পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। সরকার নির্ধারিত মূল্যে যেন চামড়া কেনাবেচা হয় এবং ট্যানারি মালিকদের সাথে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমন্বয় ঠিক থাকে, তা নিশ্চিত করতে আমরা সব পক্ষকে নিয়ে নিয়মিত তদারকি করে যাচ্ছি।"
ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সব সংকট কাটিয়ে যদি আগামী কয়েকদিন আবহাওয়া অনুকূলে থাকে এবং ঢাকার ট্যানারিগুলো দ্রুত চামড়া কেনা শুরু করে, তবে নাটোরের চকবৈদ্যনাথের মোকাম এবারও সফলভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে।