খেলাধুলা

‘কখনো রিগ্রেট করি না’- ওয়ানডেতে অবসর প্রসঙ্গে অকপট মুশফিকুর

২০২৫ সালের ৫ মার্চ সামাজিক যোগাযোগ মাধ‌্যমে পোস্ট দিয়ে মুশফিকুর রহিম ওয়ানডে থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টির তিন বছর পর ওয়ানডে থেকে সরে যান মুশফিকুর।

টি-টোয়েন্টিতে ডানহাতি ব‌্যাটসম‌্যান অনেকটা বাধ‌্য হয়ে অবসর নিয়েছিলেন। চারপাশে যখন কড়া সমালোচনা হচ্ছিল তখন সরে যান। ওয়ানডেতেও সেই পথেই যাচ্ছিল। কিন্তু আগেভাগেই সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।

যদিও তার ফর্ম তখনও ভালো ছিল না। ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ব্যর্থতার পর মুশফিকুরের ওয়ানডে দলে জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। তার ব‌্যাটে রান আসছিল না। ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। আউটের ধরন নিয়ে প্রবল সমালোচনা হচ্ছিল। জায়গা ধরে রাখায় উঠছিল বিতর্ক। বিসিবি আগ বাড়িয়ে কিংবদন্তি ক্রিকেটারকে নিয়ে সিদ্ধান্তও নিতে পারছিলেন না। মুশফিকুর বোর্ডের কাজটা সহজ করে দিয়ে নিজ থেকে সরে যান।

কিন্তু তার বাবা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘‘ওয়ানডেতে মুশফিকুর আরো কিছুটা সময় খেলতে পারতো।’’ মুশফিকুরও মনে করেন তিনি খেলতে পারতেন। কিন্তু কেন অবসর নিলেন তা নিয়ে কখনো খোলামেলা কথা বলেননি। একই অনুষ্ঠানে মুশফিকুর ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার কারণ এবং পেছনের গল্প শুনিয়েছেন,

‘‘হতাশা তো ছিলই (ওয়ানডে থেকে অবসর নেওয়া)। ওভারঅল পরিস্থিতিটাও কঠিন হয়ে গিয়েছিল। মনে আছে আমার, রমজান মাসও ছিল। রোজা রেখেছিলাম। নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলেছি। সময় দিয়েছিলাম নিজেকে। স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। বাবার সঙ্গে এই কারণে কথা বলা হয়নি, উনাকে বললে উনি কখনো মেনে নেবেন না। যতই লজিক আমি দেই না কেন…’’

‘‘আব্বা চাইবেই আমি যেন আরও যেন লম্বা সময় খেলি। আসলে সব বাবারাই চাইবে, তার সন্তানদের বড় একটি পর্যায়ে দেখতে, দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে। সেটা খেলা হোক বা অন‌্য কোনো জায়গায়।’’

‘‘টি-টোয়েন্টি নিয়েও অনেক কথা হয়েছিল। সেটা উনার কাছেও খারাপ লেগেছে। আমি চাইনি, ওয়ানডে নিয়েও এমন কিছু হোক যেটা আমার পরিবারের ওপর প্রভাব পড়বে। এখন যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ‌্যমের যুগ, আমি চাই না যে আমার কোনো কারণে কিংবা আমার কোনো সিদ্ধান্তের কারণে পরিবারের ওপর প্রভাব পড়ুক। তাদেরও একটা জীবন আছে। তাদেরও একটা প্রাইভেসি আছে।’’

‘‘আমি ওই সময়ে সময় নিয়েছি। তারাবির নামাজ শেষে অনেক ভেবেছি। আল্লাহর সঙ্গেও কথা বলেছি। এরপর আমার মনে হয়েছে এটাই সেরা সময়। এখনও অনেক মানুষ হয়তো বলতে পারে এবং আমার আব্বাও যেটা বলেন, আমি আরো হয়তো খেলতে পারতাম। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় আল্লাহ এভাবেই আমার কপালে এটা লিখে রেখেছিল এবং আমি এটা নিয়ে কখনো রিগ্রেট করি না।’’

তবে মাস তিনেক আগে ওয়ানডে দলে মিডল অর্ডারের ব‌্যর্থতা যখন মাথাচড়া দিচ্ছিল তখন মুশফিকুরের নাম আবার আলোচনায় আসে। বিশেষ করে ওয়ানডের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ দায়িত্ব পাওয়ার পর মুশফিকুরকে দলে পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। নিজ থেকে মুশফিকুরের সঙ্গে কথাও বলেন মিরাজ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। মুশফিকুর অবসর ভেঙে ওয়ানডে দলে ফিরতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।

পাকিস্তান সিরিজে মুশফিকুর সংবাদ সম্মেলনে এসে ওয়ানডেতে ফেরা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘‘ওয়ানডে ক্রিকেট নিয়ে যেটা বলা হয়েছে, আমার কাছে অবশ্যই একটি বার্তা এসেছিল। তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশ দল এখন এমন একটি পর্যায়ে আছে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো জায়গায় যাবে। যেখানে এ ধরনের সার্ভিসের প্রয়োজন হবে না, ইনশাআল্লাহ।”

২০০৬ সালে ওয়ানডে ক্রিকেটে পথচলা শুরু হয় মুশফিকুরের। এরপর খালেদ মাসুদ জায়গা দখল করে নিজের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করেন। এরপর এগিয়ে যান তরতরিয়ে। এক সময়ে মিস্টার ডিপেন্ডবল উপাধিও পান। ২০০৭, ২০১১, ২০১৫, ২০১৯ এবং ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলেছেন। উইকেট রক্ষক হিসেবে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপের ম‌্যাচ রেকর্ডটা তারই দখলে। 

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জার্সিতে ২৭৪ ওয়ানডে খেলেছেন মুশফিকুর। রান করেছেন ৭ হাজার ৭৯৫। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তিনি। উইকেট রক্ষক ব‌্যাটসম‌্যান হিসেবে তার রেকর্ড পিছিয়ে নেই। ওয়ানডেতে উইকেট রক্ষক ব‌্যাটসম‌্যান হিসেবে ৭ হাজার ২৫৪ রান করেছেন। রানের হিসেবে তার চেয়ে এগিয়ে অ‌্যাডাম গিলক্রিস্ট, মাহেন্দ্র সিং ধোনি ও কুমার সাঙ্গাকারা। তবে ১৯ বছরের লম্বা ক‌্যারিয়ার হলেও বৈশ্বিক আসরে বড় কোনো শিরোপা জেতাতে পারেননি দলকে।