রোদ থেকে ত্বককে বাঁচাতে আমরা সানস্ক্রিন ব্যবহার করি, টুপি পরি কিংবা শরীর ঢেকে রাখি। কিন্তু অনেকেই মনে করেন সানগ্লাস কেবল উজ্জ্বল আলোতে পরিষ্কার দেখার জন্য বা গাড়ি চালানোর সময় কাজে লাগে। বাস্তবে, সানগ্লাস চোখকে ক্ষতিকর অতিবেগুনি (ইউভি) রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয়, ঠিক যেমন সানস্ক্রিন ত্বককে রক্ষা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় সূর্যের আলোয় থাকলে চোখেরও নানা ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তাই সঠিক সানগ্লাস ব্যবহার শুধু ফ্যাশন নয়, চোখের স্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি।
সূর্যের আলো কীভাবে চোখের ক্ষতি করে? সূর্যের অতিবেগুনি বা (ইউভি) রশ্মি মানুষের চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এটি সূর্যালোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ত্বকের মতো চোখ এবং চোখের পাতাও এই রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হতে পারে। অতিরিক্ত (ইউভি) রশ্মির কারণে যে সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে—
চোখের পাতার ক্যানসার অতিরিক্ত সূর্যালোকের কারণে চোখের পাতায় বেসাল সেল বা স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা নামের ত্বকের ক্যানসার হতে পারে। এগুলো সাধারণত প্রাণঘাতী না হলেও অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক হতে পারে।
প্টেরিজিয়াম বা ‘সার্ফারস আই’ এটি কর্নিয়ার ওপর একটি ত্রিভুজাকার বা পাখনার মতো মাংসপিণ্ড, যা সাধারণত চোখের কোণা থেকে মণির দিকে বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিন (ইউভি) রশ্মির সংস্পর্শে থাকার ফলে এটি তৈরি হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছোট থাকলেও কখনও কখনও এটি বড় হয়ে দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
ফটোকেরাটাইটিস এটি মূলত চোখের কর্নিয়া ও চোখের পাতার ভেতরের অংশে সূর্যের আলোয় পোড়া লাগার মতো অবস্থা। এতে চোখে ব্যথা, লালভাব, পানি পড়া, ঝাপসা দেখা এবং আলোর প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা দেখা দিতে পারে।
কীভাবে সানগ্লাস সুরক্ষা দেয়? সানগ্লাসের (ইউভি) সুরক্ষা মূলত এর লেন্সের উপাদান ও বিশেষ আবরণের ওপর নির্ভর করে। পলিকার্বোনেট লেন্সে সাধারণত (ইউভি) সুরক্ষা আগে থেকেই থাকে। তবে কাচ বা সাধারণ প্লাস্টিকের লেন্সে (ইউভি) রশ্মি প্রতিরোধের জন্য বিশেষ কোটিং প্রয়োজন হয়। এই কোটিং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি আটকে দেয়, কিন্তু দৃশ্যমান আলো চোখে পৌঁছাতে দেয়। সাধারণত (ইউভি) সুরক্ষাযুক্ত সানগ্লাসে এ সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ থাকে।
সানগ্লাস কেনার সময় কী দেখবেন? সব সানগ্লাস সমান সুরক্ষা দেয় না। তাই কেনার আগে কয়েকটি বিষয় খেয়াল করা জরুরি। (ইউভি) সুরক্ষার মাত্রা ৯৫ থেকে ১০০ শতাংশ (ইউভি) সুরক্ষা আছে বা “(ইউভি) ৪০০” লেখা আছে—এমন সানগ্লাস বেছে নিন।
লেন্সের রং লেন্সের রংও কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ। বাদামি, সবুজ ও ধূসর রঙের লেন্স তুলনামূলক ভালো সুরক্ষা দেয়। হলুদ রঙের লেন্সে সুরক্ষা কম হতে পারে।
পোলারাইজড লেন্স এ ধরনের লেন্স ঝলকানি ও প্রতিফলন কমায়, যা গাড়ি চালানো বা বাইরে কাজের সময় উপকারী। তবে মোবাইল বা অন্যান্য ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। সানগ্লাসে আসলে কতটুকু (ইউভি) সুরক্ষা আছে, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে চক্ষু বিশেষজ্ঞ বা নির্দিষ্ট কিছু চশমার দোকানে থাকা ফটোমিটারের সাহায্যে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
কখন সানগ্লাস পরবেন? অনেকেই মনে করেন শুধু গ্রীষ্মেই সানগ্লাস প্রয়োজন। কিন্তু (ইউভি) রশ্মি সারা বছরই থাকে। মেঘলা দিনেও সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি মাটি, বালি, পানি, কংক্রিট কিংবা বরফ থেকে প্রতিফলিত হয়ে চোখে পৌঁছাতে পারে।
শীতকালে বরফে প্রতিফলিত (ইউভি) রশ্মির কারণে ‘স্নো ব্লাইন্ডনেস’ বা সাময়িক দৃষ্টিহীনতার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত সানগ্লাস ব্যবহারের অভ্যাস চোখ ও আশপাশের টিস্যুকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
ঘরের ভেতরে সানগ্লাস পরার প্রয়োজন আছে কি? কম্পিউটার, মোবাইল বা ট্যাবের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো (ব্লু লাইট) ঘুমের চক্রে প্রভাব ফেলতে পারে এবং দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারে চোখে শুষ্কতা ও ক্লান্তি তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান গবেষণায় ব্লু লাইট চোখের স্থায়ী ক্ষতি করে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ব্লু-লাইট ব্লকিং চশমা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে কাজ করা ব্যক্তিদের চোখের চাপ কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে ঘুমের সমস্যা সমাধানে এর কার্যকারিতা নিয়ে এখনও যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি মাইগ্রেনের রোগীদের ক্ষেত্রে FL-41 (হালকা গোলাপি রঙের) বিশেষ ধরনের চশমা আলোজনিত অস্বস্তি কমাতে এবং মাইগ্রেনের প্রকোপ হ্রাস করতে সহায়ক হতে পারে।
সানগ্লাস কেবল একটি ফ্যাশন অনুষঙ্গ নয়; এটি চোখের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা। তাই বাইরে বের হলে, বিশেষ করে রোদে, সঠিক (ইউভি) সুরক্ষাযুক্ত সানগ্লাস ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আপনার চোখ সুস্থ রাখতে এটি একটি সহজ কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ।
সূত্র: জন্স হপকিন্স মেডিসিন