প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গত ১৭ বছরে দেশের গণতন্ত্র, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার ব্যবস্থা ও নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বর্তমান সরকার একটি বিধ্বস্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে দেশের পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে।
রবিবার (৩১ মে) রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পরিশ্রম, সততা, ডিসিপ্লিন—সবকিছুর মাধ্যমে তিনি খুব অল্প সময়ে দেশের অনেক পরিবর্তন সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।”
তিনি বলেন, “বিগত ১২ তারিখে নির্বাচনের পরে আপনাদের দল সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু গত ১৭ বছরে কী হয়েছে, তার জীবন্ত সাক্ষী কিন্তু আপনারা; এখানে বলা যায় উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষ। কীভাবে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছিল, কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করা হয়েছে, কীভাবে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচনী ব্যবস্থা—সকল কিছুকে ধ্বংস করা হয়েছে, তার কমবেশি জীবন্ত সাক্ষী আপনারা এখানে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ। এখানে যারা অনলাইনে কানেক্টেড আছেন, প্রত্যেকটি মানুষ। রাজনৈতিক দলের সদস্য ছাড়াও সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষসহ প্রত্যেকটি মানুষ দেশের জীবন্ত সাক্ষী এ ব্যাপারে।”
তিনি আরো বলেন, “বর্তমান সরকার এরকমই একটি বিধ্বস্ত অবস্থার ভিতর দিয়ে দেশের পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে।”
মানুষের প্রত্যাশার প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, “মানুষ প্রত্যাশা করে তার কাছেই, যার কাছ থেকে সে কিছু পেতে পারে। একটি কথা প্রচলিত আছে যে, ঢিল কোন গাছে মারে মানুষ? আম গাছে মারে, লিচু গাছে মারে, জাম গাছে মারে। যে গাছে ফল আছে, অর্থাৎ যে দিতে পারে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশাও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কাছে। যে দল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গঠন করে গিয়েছিলেন, যে দলকে জনগণের ভিতরে ভিত্তি স্থাপন করেছেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া—সেই দলের কাছেই মানুষ প্রত্যাশা করে।”
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তাদের সকলের উদ্দেশ্যে আমি বলব যে, আমাদের সামনে প্রথমত একটি অত্যন্ত কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। আমাদের সামনে একই সাথে অত্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় অপেক্ষা করছে। এই সময়টিতে, এই গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন সময়ে, আমরা যদি হেসে খেলে চলে যাই, তাহলে খুব বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। ক্ষতি কার হবে? ক্ষতি আপনার হয়তো হবে না। ক্ষতিটি হবে দেশের। ক্ষতিটি হবে আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কিন্তু আপনারই। উত্তরাধিকার তারা।”
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সরকার একটি রাজনৈতিক সরকার। অর্থাৎ একটি রাজনৈতিক দল যার নীতি আছে। বর্তমান সরকার একটি সরকার, অর্থাৎ একটি রাজনৈতিক দল যার নীতি আছে, যার আদর্শ আছে, যার পরিকল্পনা বা ম্যানিফেস্টো আছে। যে পরিকল্পনা বা ম্যানিফেস্টো আমরা দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলাম ১২ তারিখের নির্বাচনের আগে।”
তিনি বলেন, “দেশের মানুষ এই ম্যানিফেস্টো বা পরিকল্পনা দেখেছে, শুনেছে, বুঝেছে এবং ১২ তারিখে তারা তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধানের শীষে ভোট দিয়ে ধানের শীষকে সেই দায়িত্ব দিয়েছে, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য।”
নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “ইশতেহার যেহেতু ১২ তারিখ পর্যন্ত বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পরিকল্পনা ছিল, ১২ তারিখ পর্যন্ত এই ম্যানিফেস্টোটি বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ম্যানিফেস্টো ছিল। কিন্তু ১৩ তারিখ সকাল থেকে, বাংলাদেশের মানুষের রায় যখন আমরা জানতে পারলাম, যখন ১৫১ পার হয়ে গেল, তখন বোঝা গেল বাংলাদেশের মানুষ টু-থার্ড মেজরিটি দিয়েছে এই পরিকল্পনার পক্ষে, এই ম্যানিফেস্টোর পক্ষে।”
তিনি বলেন, “অর্থাৎ এই ম্যানিফেস্টোটি বা এই পরিকল্পনাটি এখন শুধুমাত্র আর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নয়। বরং এই ম্যানিফেস্টোটি বা এই পরিকল্পনাটি হচ্ছে সেই মানুষদের, যারা এটির পক্ষে রায় দিয়েছে। ৫২ শতাংশ মানুষ যারা ভোটে অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে ৫২ শতাংশ মানুষ—এটি তাদের ম্যানিফেস্টো, এটি তাদের পরিকল্পনা। রাজনৈতিক দলের সরকার হিসেবে অবশ্যই এটি আমাদেরকে পালন করতে হবে। এটি আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে।”
শহীদ জিয়ার উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন বর্তমান ম্যানিফেস্টোতে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে আমরা শহীদ জিয়ার খাল খনন কর্মসূচির কথা শুনেছি। আমাদের পরিকল্পনা, ম্যানিফেস্টোর মধ্যে এই পরিকল্পনার কথা আছে। আমরা এখানে শহীদ জিয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শুনেছি কিভাবে শহীদ জিয়া শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছিলেন। শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন, শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন জাতিকে। ঠিক তারই রিফ্লেকশন শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় আমাদের ম্যানিফেস্টোর মধ্যে আছে।”
তিনি বলেন, “এখানে বক্তারা আলোচনা করেছেন কীভাবে গার্মেন্ট শিল্প, যে গার্মেন্ট শিল্পকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি, যে গার্মেন্ট শিল্প আমাদের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সাহায্য করছে, সে গার্মেন্ট শিল্পের ভিত্তিপ্রস্তর কীভাবে স্থাপিত হয়েছিল শহীদ জিয়ার সময়। ঠিক একইভাবে, অর্থাৎ শিল্পের বিপ্লব—আমরা তারই রিফ্লেকশন রেখেছি আমাদের এই ম্যানিফেস্টোর মধ্যে। অর্থাৎ আমাদের দেশে কীভাবে শিল্পের প্রসার আবার ঘটানো যায়, কীভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, কীভাবে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে গড়ে তুলতে পারি। যেমন বন্ধ কলকারখানাগুলো চালু করা—সেই পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি। ঠিক একইভাবে আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি কিভাবে নতুন নতুন ডাইভার্সিফিকেশন করব, কী কী ইন্ডাস্ট্রি এই দেশে আমরা গড়ে তুলতে পারি। সেই পরিকল্পনাগুলোকে আমরা আমাদের ম্যানিফেস্টোর মধ্যে রেখেছি।”
নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান—এখানে আমরা শুনেছি ডক্টর জাহিদের বক্তব্যে—নারী বিষয়ক যে মন্ত্রণালয়, সেই মন্ত্রণালয়ের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছিল, সেটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়া কীভাবে জিনিসটিকে তুলে এনেছিলেন, সেটি আমরা দেখেছি। আমরা নারীদেরকে এমপাওয়ার্ড করার জন্য আমাদের ম্যানিফেস্টোর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিষয়ক একটি বিষয় রেখেছি।”
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “সরকার তখনই সফল হতে পারবে, যখন এই দলের কর্মী হিসেবে আপনি সরকারের প্রত্যেকটি সঠিক কার্যক্রমকে সহযোগিতা করতে থাকবেন। সঠিকভাবে, সঠিক কাজটিকে আপনি সহযোগিতা করতে থাকবেন। তখনই এই সরকারের পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, “আমাদের সংসদের এমপি, আমাদের ৫০ জন—আমি সহ—ক্যাবিনেট সদস্য আছেন। আমরা শুধু পরিশ্রম করলেই কিন্তু সফল হব না। আপনাদের সকলের সহায়তা প্রয়োজন হবে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “১২ তারিখের নির্বাচনের আগে যেভাবে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে এই দলকে আপনারা জিতিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন, ঠিক জিতিয়ে আনার পরেই কিন্তু কাজ শেষ হয়ে যায় না। বরং আমাদের সেই অক্লান্ত পরিশ্রমকে এখন আবারও কন্টিনিউ করতে হবে। একটি নির্বাচনের মাধ্যমে যেমন আমরা জয়ী হয়ে এসেছি, ঠিক একইভাবে আমাদের কাজগুলো, আমাদের লক্ষ্যগুলো সফল করার মাধ্যমে একটি সফল সরকার আমাদেরকে হতে হবে।”
তিনি বলেন, “আসুন, আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করি, যে ম্যানিফেস্টোর পক্ষে বাংলাদেশের মানুষ রায় দিয়েছে, সেই ম্যানিফেস্টোকে বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে একটি সফল সরকারের কার্যক্রম আমরা শেষ করতে পারি। তাহলেই আমরা একমাত্র ৩০ মে-তে শহীদ জিয়ার প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করতে সক্ষম হব বলে আমি বিশ্বাস করি। আসুন—এতেই হোক সরকার গঠন করার পরে শহীদ জিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী বা শাহাদাতবার্ষিকীতে আমাদের শপথ। এটিই হোক আজকে আমাদের প্রতিজ্ঞা।”
আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সিনিয়র নেতা এবং বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।