ঈদুল আজহার ছুটির রেশ এখনো কাটেনি। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে এবং নাগরিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে রাজধানীর বাসিন্দাদের প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক রমনা পার্ক। ঈদের চতুর্থ দিন রবিবার (৩১ মে) বিকেল থেকেই পার্কজুড়ে ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। ইট-পাথরের যান্ত্রিক এই নগরে সবুজ গাছপালা আর লেকের স্নিগ্ধতায় শান্তির পরশ পেতে সব বয়সী মানুষ ছুটে আসেন এখানে।
বিকেল ২টার পর থেকেই রমনা পার্কের প্রতিটি প্রবেশপথে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পার্কের সবুজ চত্বরগুলো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। পরিবার, পরিজন আর বন্ধুদের নিয়ে এখানে এসে দারুণ সময় পার করছেন নগরবাসী। লেকের পাড়ে বেঞ্চগুলোতে বসে আড্ডায় মেতেছেন অনেকে; আবার অনেক পরিবারকে খোলা ঘাসের ওপর মাদুর পেতে ছোটখাটো পিকনিকের আমেজে সময় কাটাতে দেখা গেছে।
পার্কের সবচেয়ে কোলাহলপূর্ণ ও প্রাণবন্ত দৃশ্য ছিল শিশু চত্বরে। দোলনা ও বিভিন্ন রাইডে শিশুদের আনন্দধ্বনি আর ছোটাছুটি পার্কের পরিবেশকে আরো উৎসবমুখর করে তোলে। শিশুদের এই আনন্দময় মুহূর্তে অভিভাবকদের মুখেও ছিল তৃপ্তির হাসি। পার্কের ভেতরে থাকা ফুচকা, চটপটি আর আইসক্রিমের দোকানগুলোতে ছিল কেনাবেচার ধুম। উৎসবের দিনে প্রিয়জনদের নিয়ে খোলা পরিবেশে এমন খাবার উপভোগের মজাই যেন আলাদা।
পার্কে আসা দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার যান্ত্রিকতার বাইরে একটু নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য রমনা পার্ক তাদের বিশেষ পছন্দ।
বেসরকারি চাকরিজীবী রিয়াজুল করিম বলেন, “ঢাকার ব্যস্ত জীবনে দম ফেলার ফুরসত থাকে না। ছুটির দিনে রমনা পার্কে আসলে মনে হয় একটু শান্তির নিঃশ্বাস নেওয়া গেল।”
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তানজিম আহমেদ জানান, বন্ধুদের সঙ্গে লেকের পাড়ে বসে আড্ডা দেওয়া এবং ছবি তোলাই তাদের ঈদের অন্যতম প্রধান আনন্দ।
পুরান ঢাকার বাসিন্দা ছানাউল হক বলেন, “ঢাকার 'ফুসফুস' হিসেবে পরিচিত রমনা পার্ক রাজধানীবাসীর কাছে কেবল একটি পার্ক নয়, বরং যান্ত্রিক জীবনে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষের একটুখানি স্বস্তির আশ্রয়স্থল।”
উৎসবের এই আনন্দের মধ্যেও কিছু অব্যবস্থাপনার চিত্র ও প্রত্যাশার কথা উঠে এসেছে দর্শনার্থীদের বয়ানে।
ব্যবসায়ী মাইদুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শিশুদের বিনোদনের জন্য এখানে পর্যাপ্ত রাইড নেই। স্বল্প আয়ের মানুষের বিনোদনের সুযোগ আরো বাড়ানো প্রয়োজন।”
গৃহিণী সাদিয়া রহমান পার্কের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও শিক্ষিকা মাহফুজা বেগম জানান ভিন্ন সমস্যার কথা। তিনি বলেন, “নারী দর্শনার্থীদের জন্য পার্কে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও পর্যাপ্ত টয়লেটের অভাব রয়েছে। এই মৌলিক সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা দরকার।”
পার্কের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য রাফিউল হাসান জানান, ঈদের দিন থেকে শুরু করে রবিার পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ এখানে ভিড় করছেন। দর্শনার্থীদের এই বিপুল চাপ সামলাতে তাদের বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদের ছুটিতে রমনা পার্কের এই চিত্রই বলে দেয় নগরবাসী প্রকৃতিকে কতটা ভালোবাসে। তবে, দর্শনার্থীদের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পার্কটিকে আরো আধুনিক, শিশুবান্ধব এবং পরিচ্ছন্ন রাখা এখন সময়ের দাবি। পার্কের নাগরিক সুবিধাগুলো আরেকটু বাড়িয়ে দিলে রাজধানীর প্রধান বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে রমনা পার্কের আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যাবে।