ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর মিলনস্থলে দূর থেকে চোখে পড়ে সবুজে ঘেরা এক ভূখণ্ড। চারদিকে জলরাশির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভূমিটি স্থানীয়দের কাছে ‘ধাঁধার চর’ নামে পরিচিত।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাণীগঞ্জ এলাকার কাছে অবস্থিত এই চরকে ঘিরে সাম্প্রতিক নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। একদল মানুষ এটিকে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চান। অন্যদিকে, স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন হলে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হতে পারে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, নদীর বুকে পলি জমে ধীরে ধীরে চরটির জন্ম। সময়ের সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে উর্বর কৃষিভূমিতে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি যেন গাজীপুর ও নরসিংদীর মাঝখানে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ড। বর্ষায় চারদিকের পানি বেড়ে গেলে চরটি সত্যিকারের দ্বীপের রূপ নেয়। শুষ্ক মৌসুমে এটি পরিণত হয় সবুজে মোড়ানো কৃষি জনপদে।
প্রায় চার কিলোমিটার বিস্তৃত এই চরে রয়েছে বিভিন্ন ফলজ ও বনজ গাছ। পেয়ারা, কলা, কুল, জাম ও তালগাছের পাশাপাশি জন্মেছে নানা ধরনের ওষুধি উদ্ভিদ। কৃষকরা এখানে আলু, সরিষা, ভুট্টা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদ করেন। তাদের দাবি, নদীর পলিমাটির কারণে জমির উর্বরতা এত বেশি যে অনেক ক্ষেত্রেই কম সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়।
অতীতে একাধিক বড় বন্যার ধাক্কা সামলেছে ধাঁধার চর। বিশেষ করে ১৯৬০, ১৯৮৮ এবং ১৯৯৮ সালের বন্যায় চরটি পানিতে তলিয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে নতুন পলি জমে মাটির উর্বরতা আরো বৃদ্ধি পায়।
ধাঁধার চরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফলজ গাছ
প্রকৃতির মতোই সমৃদ্ধ এর ইতিহাস। স্থানীয় গবেষক ও প্রবীণদের মতে, চরটি জেগে ওঠার পর এর মালিকানা নিয়ে তৎকালীন ভাওয়াল রাজা ও বলদা রাজার মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। পরে এটি ভাওয়াল রাজ এস্টেটের নিয়ন্ত্রণে আসে। ব্রিটিশ আমলে জরিপের মাধ্যমে কৃষকদের খাজনার বিনিময়ে জমি ব্যবহারের অধিকার দেওয়া হয়। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে জমির মালিকানা স্থানীয়দের হাতে চলে আসে।
চরের পাশের মানি বাড়ি এলাকার বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম মো. হানিফ আজম বলেন, “ধাঁধার চর নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার হলেও বাস্তব ইতিহাস ভিন্ন। বর্তমানে শত শত কৃষক এখানে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।”
ভাওয়ালের আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা নাজিব মাহফুজ খান বলেন, “ধাঁধার চর শুধু একটি চর নয়; এটি নদীর গতিপথ, জনবসতির পরিবর্তন এবং স্থানীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। এর প্রকৃত ইতিহাস জানতে হলে পুরোনো মানচিত্র, ব্রিটিশ আমলের জরিপ নথি এবং নদীপথের ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন।”
ধাঁধার চর জীববৈচিত্র্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় পাখির বিচরণ দেখা যায়। মাছরাঙা, বক, পানকৌড়িসহ অসংখ্য পাখি এ অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করেছে। স্থানীয়দের দাবি, কখনো কখরো নদীতে বিপন্ন জলজ প্রাণী শুশুকও দেখা যায়।
চরের কাছেই রয়েছে ঐতিহাসিক ঘিঘাট। প্রতি বছর অষ্টমী তিথিতে এখানে পুণ্যস্নানে অংশ নিতে ভক্তদের সমাগম ঘটে। ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে এই অঞ্চল।
কয়েক বছর আগে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের পর ধাঁধার চরকে ঘিরে পর্যটন সম্ভাবনার আলোচনা আরো জোরালো হয়। ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে এর সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে, স্থানীয়দের বড় একটি অংশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তাদের মতে, পরিকল্পনাহীন পর্যটন উন্নয়ন হলে কৃষিজমি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসলাম মিয়ার ভাষায়, “ধাঁধার চর শুধু একটি স্থান নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, কৃষি ও নদীনির্ভর জীবনের অংশ। উন্নয়ন হোক, তবে তা যেন প্রকৃতি ও মানুষের স্বার্থ রক্ষা করেই হয়।”
নদীর বুক থেকে জেগে ওঠা এই সবুজ ভূখণ্ড আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে পর্যটনের সম্ভাবনা, অন্যদিকে ইতিহাস, কৃষি ও প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা। ধাঁধার চর শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোবে, সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এর আগামী দিনের পরিচয়। তবে, এতটুকু নিশ্চিত এই চর এখনো অজানা ইতিহাস ও গল্প নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে।