বিশ্বজুড়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৮ থেকে ৮০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে বিভিন্ন বৈশ্বিক শিক্ষা ও শিক্ষার্থী চলাচলবিষয়ক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসম্মত শিক্ষা, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষাই শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থী চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বিবেচনা করে আরো পরিকল্পিতভাবে গন্তব্য নির্বাচন করছে।
৭০ লাখ ছাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৭০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী নিজ দেশের বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করেছে। স্নাতক, স্নাতকোত্তর, গবেষণা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থী এই সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষাবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক ডিগ্রির বৈশ্বিক স্বীকৃতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ বিনিময়ের গুরুত্ব বাড়ার কারণে বিদেশে পড়াশোনার প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জনপ্রিয় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্য
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য এখনো সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে ১১ লাখের বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছে। কানাডায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। উচ্চশিক্ষার মান, অভিবাসনবান্ধব নীতি এবং পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ থাকায় দেশটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
অন্যদিকে, প্রায় সাড়ে সাত লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়ে যুক্তরাজ্যও শীর্ষ গন্তব্যগুলোর একটি। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্র্যাজুয়েটদের জন্য পোস্টস্টাডি ওয়ার্ক সুবিধা দেশটির জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সহায়তা করছে।
এছাড়া, অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় সাত লাখ এবং জার্মানিতে প্রায় চার লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। তুলনামূলক কম খরচে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার কারণে জার্মানি বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর শীর্ষে ভারত ও চীন
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারত ও চীন এখনো শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ লাখ ভারতীয় শিক্ষার্থী বিদেশে পড়াশোনা করছে। একই সময়ে বিদেশে অধ্যয়নরত চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ লাখ। এছাড়া, ভিয়েতনাম থেকে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি এবং নাইজেরিয়া থেকে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে গেছে।
বাংলাদেশও এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে।
কেন বিদেশে পড়তে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডিগ্রি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করছে।
দ্বিতীয়ত, অনেক দেশ শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ, ইন্টার্নশিপ এবং স্থায়ী কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত রাখছে। তৃতীয়ত, নতুন ভাষা, সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে। এছাড়া, উন্নত জীবনমান, গবেষণা সুবিধা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাও বিদেশে পড়াশোনার আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শিক্ষাব্যয় বেড়েছে
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫২ হাজার ৭৯৯ জন। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা প্রায় ৬৬৭ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি ডিগ্রি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার প্রতি আগ্রহ বাড়ার কারণে পরিবারগুলো আগের চেয়ে বেশি বিনিয়োগ করছে।
চ্যালেঞ্জও কম নয়
বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ সবসময় সহজ নয়। উচ্চ টিউশন ফি, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক শিক্ষার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে কঠোর ভিসা নীতি, নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্যও শিক্ষার্থীদের জন্য বাধা সৃষ্টি করে।
তারপরও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক কম খরচ, কাজের সুযোগ, উন্নত জীবনমান এবং পড়াশোনা-পরবর্তী সুবিধার ভিত্তিতে গন্তব্য নির্বাচন করছে।
নতুন গন্তব্য হিসেবে উঠে আসছে জার্মানি, ফ্রান্স ও জাপান
প্রথাগত গন্তব্যগুলোর বাইরে নতুন কিছু দেশও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করছে। জার্মানি, ফ্রান্স এবং স্পেন কম খরচে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার কারণে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। অন্যদিকে, প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার জন্য জাপানও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা এখন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক ব্যয়, চাকরির সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটির বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী
বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটির বেশি হতে পারে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তির বিস্তার এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা আরো বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, বাংলাদেশের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক শিক্ষার সুযোগ আরো কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
মেধা পাচার নাকি মানবসম্পদ উন্নয়ন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি মেধা ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর মাধ্যমে একটি দেশের মানবসম্পদ সমৃদ্ধ হলেও দেশে ফেরার সুযোগ ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হলে মেধা পাচারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ কারণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ স্থানীয় উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ কর্মসূচি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক শিক্ষা পরিস্থিতি বলছে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার চাহিদা আরো বাড়ছে এবং শিক্ষার্থীরা আগের চেয়ে বেশি সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও এই বৈশ্বিক প্রবণতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চশিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, দেশের অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সোর্স: সেন্টার ফর এডুকেশন (সিএফই)