সম্প্রতি দেশে শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় উদ্বিগ্ন সবাই। পুলিশ বলছে, গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন জেলায় পারিবারিক কলহ, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করতে গিয়ে এবং জমিজমা বিরোধসহ বিভিন্ন কারণে শিশুরা বলি হচ্ছে।
এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার হয়নি। এ কারণে ঘটনা আরো বাড়ছে। সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিচারের দাবিতে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভে পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ঢাকায় শিশুকে ধর্ষণ শেষে হত্যার রেশ কাটতে না কাটতে চট্টগ্রামে এক শিশুকে ধর্ষনের ঘটনায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংঘর্ষ পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান সাপোর্ট রাইটস সোসাইটির (এইআরএসএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ৭ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত ১৬ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের চান্দের চর গ্রামের মদিনাপাড়ায় আছিয়া আক্তার নামে ১০ বছরে বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় ধর্ষণের পর লামিয়া আক্তার নামে এক চার বছরের শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর এলাকার একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ৬ মে সকালে সিলেটের সদর উপজেলার জালালাবাদে ৪ বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণ চেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানা চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকায় আরেক শিশুকে ধর্ষণ করা করা হয়। শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের পর হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি করা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে ধর্ষককে আটক করে থানায় নিয়ে আসতে চাইলে তাকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এলকাবাসী। এক পর্যায়ে এলাকাবাসী ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
২৪ মার্চ ১১ বছর বয়সী ওই কন্যাশিশু নিখোঁজ হয়। এর দুই দিন পর ২৬ মার্চ ওই শিশুর বাড়ির পাশের একটি তুলার গুদাম থেকে দুর্গন্ধ বের হলে গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে লাশ দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা। শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ গুদামের ভেতরে ফেলে রাখা হয়।
ওই ভবনের পাশের সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা গেছে, অভিযুক্ত ফয়সাল শিশুটিকে নিয়ে গুদামের ভেতর ঢোকেন। পরে তিনি একা বেরিয়ে যান। এ ঘটনায় ২৬ মার্চ ফয়সালকে আসামি করে হাটহাজারী থানায় মামলা করেন ওই শিশুর মা। ৩ মাস পর ফয়সাল ও তার সহযোগিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন’ নামে আলাদা একটি সেল রয়েছে। এ সেলের মাধ্যমে সারা দেশে নির্যাতনের শিকার শিশু ও নারীদের বিষয়ে যেসব মামলা হয় সেগুলো মনিটরিং করা হয়। সারা দেশে সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার বিট পুলিশিং কার্যক্রম রয়েছে। প্রতিটি বিটে একজন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই), অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর (এএসআই) এবং কনস্টেবল রয়েছে। এসব বিটের মাধ্যমে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিক জনসচেতনতা তৈরি এবং অপরাধের ক্ষেত্রে কী ধরনের সাজা হয় সেই বার্তাগুলো দিয়ে থাকে। ২০২১ সালে পুলিশ সদর দপ্তর দেশের প্রতিটি থানায় নারী ও শিশু হেল্পডেস্ক চালু করেছিল। এসব হেল্পডেস্ক চালুর উদ্দেশ্য ছিল নির্যাতন বা সহিংসতার শিকার শিশু বা নারীরা যাতে স্বচ্ছন্দে তাদের অভিযোগগুলো জানাতে পারে। প্রতিটি হেল্পডেস্কে নারী এসআই আলাদাভাবে নিয়োগ করা হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে শিশুরা সবচেয়ে বেশি পারিবারিক নির্যাতন বা সহিংসতার শিকার হয়। পারিবারিক কলহে শিশুরা বাবা-মায়ের দ্বারা খুন হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পারিবারিক অস্থিরতা,সচেতনতার অভাব, দারিদ্র্য, প্রযুক্তির অপব্যবহার- এসব কারণে শিশু নির্যাতন বাড়ছে।
এসব ঘটনায় পুলিশ অনেক সময় বাদী হয়ে মামলা করে। শিশু নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানির মতো মামলাগুলো পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে। বিভিন্ন সামাজিক অনুসন্ধানে শিশু নির্যাতন বন্ধে মানুষকে সচেতনও করা হয়।
মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “দেশে আইন আছে শুধু কাগজে-কলমে। শিশুদের নিয়ে আইনে যা আছে বাস্তবে তা দেখা যায় না। আমাদের সমস্যা হচ্ছে শিশু সনদ আছে। তাতে আমরা স্বাক্ষর করেছি। শুধু ওইটুকুই। সব ধরনের সহিংসতার দায় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে পারছে না। পরিবার সারাক্ষণ পাহারা দিতে পারবে না। এসব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ দরকার। সাম্প্রতিক সময়েই এসব ঘটনা ঘটছে তা নয় আগেও ঘটেছে।”
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, গত পাঁচ বছরে দেশে মোট দুই হাজার ৩৩৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৬ সালে ৯৪টি, এর আগে ২০২৫ সালে ৪৫৬টি, ২০২৪ সালে ২৩৪টি, ২০২৩ সালে ৩১৪টি, ২০২২ সালে ৫৬১টি এবং ২০২১ সালে ৭৭৪টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪৪৯টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৩৪টি, ২০২৫ সালে ১৬৭টি, ২০২৪ সালে ৬৬টি, ২০২৩ সালে ৮৫টি। এছাড়া গত ১০ বছরে যত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি ঘটনায় কন্যাশিশু ৬ মাস থেকে শুরু করে ৫ বছর, ৬ বছর থেকে শুরু করে ১২ বছর, ১৩ বছর থেকে শুরু করে ১৮ বছর পর্যন্ত ৩টি বয়সি শিশু ও কিশোরীদের বয়সভেদে এ পরিসংখ্যান মিলেছে।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, “ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আইন অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট প্রসিডিউরের মধ্য দিয়ে যেতেই হয়। মামলাগুলোতে মূলত দুটি জায়গায় সময়ক্ষেপণ হয়। প্রথমত, তদন্তে বিলম্বের কারণে পুলিশ রিপোর্ট সময়মতো জমা না পড়া। দ্বিতীয়ত, সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। অনেক সময় সাক্ষীদের হাজির করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এ কারণে এসব মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্ব হচ্ছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “শিশুদের সুরক্ষা করার দুটি ক্ষেত্র দেখি। প্রথমত. আইন দ্বারা। দ্বিতীয়ত. সামাজিক অনুশাসন দ্বারা অপরাধীদের সামাজিকভাবে চাপে রাখা। বাস্তবতা হচ্ছে এ দুটির কোনোটিরই প্রয়োগ বাংলাদেশে নেই। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ বা হত্যার মতো ঘটনায় মামলা হলে কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। দেশে শিশু ও নারীদের সুরক্ষায় ভূরি ভূরি আইন আছে। কিন্তু একটি আইনেরও সঠিক কোনো প্রয়োগ নেই।”