আন্তর্জাতিক

ভেঙে চুরমার মমতার দল

কার্যত ভেঙে চুরমার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে গড়া দল তৃণমূল কংগ্রেস। মহারাষ্ট্র মডেলে জোট বাঁধলো বিদ্রোহী তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়করা। কয়েকদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাংলার রাজনীতিতে জন্ম নিল মমতাহীন ‘আসল তৃণমূল।’ মমতার সিদ্ধান্তকে ছুড়ে ফেলে ৫৮ বিদ্রোহী বিধায়কের সমর্থনে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত হলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধায়কদের বিদ্রোহে বেসামাল মমতা দল ভাগ হতেই দলের সব সাংগঠনিক পদ অবলুপ্তির ঘোষণা দিয়েছেন।

অংকের হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হতে গেলে ৩০ জন বিধায়কের সমর্থন প্রয়োজন। ঋতব্রতের পক্ষে রয়েছেন ৫৯ জনের বেশি তৃণমূল বিধায়ক। তাই তারা ঋতব্রতকেই বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসুর কাছে চিঠি জমা দিয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে ওই চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দলের নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ভোটে হেরে যাওয়ার পর তৃণমূলের পক্ষে বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। তার পর তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পক্ষে বিধায়কদের স্বাক্ষর করা একটি দলীয় রেজিলিউশনের চিঠি দেওয়া হয় বিধানসভায়। সেখানে বিষয়টি জানানো হয় এবং শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন করা হয়।

কিন্তু সেই চিঠিতে বিধায়কদের সই জালের অভিযোগ ওঠে দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ৷ তদন্ত শুরু করে সিআইড। একাধিক বিধায়কের বাড়িতে যান তদন্তকারীরা। নোটিশ দেওয়া হয় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নবান্নে এক সাংবাদিক বৈঠকে জানান, সই জালের বিষয়টি সামনে এনেছেন তৃণমূলের দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। তার পরই তৃণমূল থেকে ওই দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করা হয়।

এরপরেই তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী শিবিরের আগুন কার্যত জ্বলে ওঠে। গত ৩১ মে মমতার কালীঘাটের বাড়িতে বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছিল। ৮০ তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে হাজির হয়েছিলেন মেরেকেটে ১৭! বৈঠকই ভেস্তে যায়। অন্যদিকে সেদিনই বহিষ্কৃত দুই বিধায়ক কলকাতার একটি বিলাসবহুল হোটেলে ৫০ জন  বিদ্রোহী বিধায়ককে নিয়ে বৈঠক করে বলে জানা যায়। তখনই দল ভেঙে যাওয়ার স্পষ্ট আভাস মিলেছিল। 

এরপর বুধবার বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কেরা স্বশরীরে তাদের স্বাক্ষরিত চিঠি বিধানসভার অধ্যক্ষের হাতে তুলে দিয়ে জানিয়ে দেন, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাদের নেতা হিসাবে নির্বাচিত করছেন। জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা, শিউলি সাহাকে ডেপুটি লিডার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। আর আখরুজ্জামানকে বেছে নেওয়া হয়েছে বিরোধী দলের মুখ্য সচেতক হিসেবে। সেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই তাদের নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, তৃণমূল এবারের ভোটে ৮০টি আসনে জিতেছে। দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে গেলে ঋতব্রতদের অন্তত ৫৩ জন বিধায়কের প্রয়োজন ছিল। বুধবার সকালে দেখা গেল বিদ্রোহী বিধায়কের সংখ্যা তার চেয়েও অনেক বেশি। এদিন বিধানসভায় যে বৈঠকে ঋতব্রতকে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়, সেখানে ৫৯ জন বিধায়কের সই রয়েছে। অধ্যক্ষের কাছে যে চিঠি তারা জমা দিয়েছেন, সেখানে জানানো হয়েছে যে আরো ছয়জন পরে স্বাক্ষর করবেন।

এর ফলে মহারাষ্ট্র মডেলে বিদ্রোহী গোষ্ঠী এখন থেকে আসল তৃণমূল হিসেবেই বিবেচিত হবেন। পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসের দলের রাস ও দলের সিম্বল মমতার থেকে সরে গিয়ে চলে গেলো বিদ্রোহী বিধায়কদের হাতে। এমন অবস্থায় কালীঘাট সূত্রে জানা গিয়েছে, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই প্রস্তাব মানতে রাজি নন। ফলে রাজ্যে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হল।

এই ধরনের সংকট কয়েকবছর আগে দেখা গিয়েছিল মহারাষ্ট্রে। শিবসেনার বিদ্রোহীদের নিয়ে একনাথ শিন্ডে ও এনসিপি-র বিদ্রোহীদের নিয়ে অজিত পাওয়ার (এখন প্রয়াত) দল ভেঙেছিলেন। তারাই নিজেদের আসল দলের অংশ বলে দাবি করেছিলেন। অজিত পাওয়াররাও এনসিপি প্রধানকে শরদ পাওয়ারকে নিজেদের নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

তার পর নির্বাচন কমিশন একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ারের অংশকে যথাক্রমে শিবসেনা ও এনসিপি-র আসল বলে জানিয়েছিল। এই নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে রায় দেয়। উদ্ধব ঠাকরে ও শরদ পাওয়ারকে নতুন দল তৈরি করেই রাজনৈতিক অস্তিত্ব বাঁচাতে হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূলের সংকটও সেই দিকেই যেতে পারে। ঋতব্রতদের কাছেই থাকতে পারে তৃণমূল ও দলের প্রতীক। যাকে সামনে রেখে তৃণমূলের জন্ম-উত্থান, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের ‘দখল’ রাখতে লড়তে হতে পারে আইনি লড়াই।

এমন ঘটনার পরপরই দলের সব কমিটি ও সংগঠন ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেয় তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল ছাত্র পরিষদ, মহিলা তৃণমূল কংগ্রেস, তৃণমূল যুব কংগ্রেস, ট্রেড ইউনিয়ন, সংখ্যালঘু সেল-সহ সমস্ত কমিটি, সংগঠন ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এরসঙ্গেই জানানো হয়েছে- দল প্রতিটি স্তরে আত্মসমীক্ষা, কর্মসম্পাদন পর্যালোচনা এবং সাংগঠনিক মূল্যায়ন করবে। এই পর্যালোচনার ফলাফলের ভিত্তিতে মূল সংগঠন এবং সমস্ত সহযোগী সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করে যথাসময়ে তা ঘোষণা করা হবে।  একইসঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে, দুর্দিনে কারা রইলেন সঙ্গে, কারা রইলেন না, সেদিকে নজর দিয়ে এবার ঘর গোছাবেন মমতা। 

দলের এক্স হ্যান্ডেলের পোস্টে লেখা হয়েছে, “দল তার সংগঠনকে শক্তিশালী করতে এবং নতুন উদ্যম ও উদ্দেশ্য নিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”