নিউজিল্যান্ডে যাওয়ার আগেই আমরা, অর্থাৎ আমার স্ত্রী মেহেরুন এবং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, একদিন অকল্যান্ড ওয়ার মেমোরিয়াল মিউজিয়াম দেখতে যাব। কেননা শুনেছি এবং প্রচার মাধ্যমে জেনেছি, সেখানে দেশ-বিদেশের উৎসাহী দর্শক ও পর্যটকদের জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে নিউজিল্যান্ড যুদ্ধের বিভিন্ন রোমাঞ্চকর গল্পগাথা, বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মাউরি আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও হস্তশিল্পের চমৎকার কারুকাজ এবং পলিনেশিয়ান নাবিকদের নানান ধরনের কৃতিত্বের নমুনা।
সকালে হোটেলে নাস্তা সেরে উবার ডেকে সোজা চলে যাই ওয়ার মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে। সবুজ গাছ-গাছালি ঘেরা বিস্তৃত এলাকাজুড়ে পার্কের ভেতর আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে পনের মিনিটের মধ্যে আমরা সেখানে পৌঁছে যাই। দালানের ভেতরে ঢুকে অভ্যর্থনা কাউন্টারে গিয়ে টিকিট সংগ্রহ করি। ডেস্কের মহিলা টিকিট দেওয়ার আগেই একটা ছাপা পুস্তিকা দেখিয়ে বললেন, ভবনের নিচের তলায় একাংশ সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ কাজের জন্য সাময়িক বন্ধ রয়েছে। তাই সেখানে যাওয়া যাবে না এবং এ কারণে প্রবেশ মূল্য পাঁচ ডলার (নিউজিল্যান্ড) কম হবে, অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্য বত্রিশ ডলার পরিবর্তে সাতাশ ডলার লাগবে।
ট্যুর গাইডের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, গাইডসহ এক ঘণ্টা ট্যুরের জন্য জনপ্রতি আরও কুড়ি ডলার লাগবে। তারপর তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, গাইডেড ট্যুর শুরু হতে আধা ঘণ্টা বাকি আছে। আমি হ্যাঁ-সূচক ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে ওয়ালেট থেকে ট্রাভেল কার্ড বের করে মূল্য পরিশোধ করি। এক ফাঁকে তাকিয়ে দেখি কাউন্টারের পেছনের দেওয়ালে বিভিন্ন ধরনের দর্শকদের জন্য প্রবেশ মূল্যের তালিকা ঝুলানো রয়েছে। অকল্যান্ড বাসিন্দাদের জন্য কোনো প্রবেশ মূল্য নেই। তবে অন্যান্য শহর থেকে আগত দর্শণার্থীদের জন্য প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি দশ ডলার। স্থানীয়দের উৎসাহিত করার জন্য প্রবেশ মূল্যের তারতম্য দেখে আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। কিন্তু বিদেশি পর্যটকদের জন্য তিন গুণের বেশি।
একসময় আমার হাতে টিকিট দিয়ে মহিলা আরও বললেন, ট্যুর গাইড ভবনের উল্টোদিক, অর্থাৎ মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের প্রবেশপথ থেকে শুরু করবে। ভবনের ভেতর দিয়ে যাওয়া যায়, তবে সংস্কারের কাজের জন্য বেশ ঘোরানো-পেঁচানো পথ। বরং ভবনের বাইরে দিয়ে গেলে সহজ হবে এবং সময়ও কম লাগবে। যেহেতু আমাদের হাতে সময় ছিল, তাই সোজাসুজি ঢুকে পড়ি উল্টোদিকের স্যুভেনির শপে। ফেরার পথে ছোটখাটো কিছু উপহার সামগ্রী কেনার ইচ্ছে নিয়ে মিনিট পনের এটা-সেটা নেড়েচেড়ে দেখে বেরিয়ে আসি।
সেদিন আকাশ ছিল কৃষ্ণবরণ মেঘে ঢাকা এবং চারদিকে ছড়িয়ে ছিল আবছা অন্ধকার। আর ঠান্ডা বাতাস এসে চোখেমুখে হালকা পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল। পাহাড়ের উপর বেশ ভালোই লাগছিল। তারপর ভবনের বাইরে এসে উল্টো দিকে যাই এবং ভবনে ঢোকার আগে পুরো ভবনের বেশ কিছু ছবি তুলেছি।
হালকা গোলাপি পাথরের তৈরি ভবনের ভেতর ঢুকে কাউন্টারের মহিলাকে ট্যুর গাইডের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি খানিক দূরে দাঁড়ানো এক মহিলাকে দেখিয়ে দিলেন। মহিলা কাছে এসে হাসি মুখে নিজের নাম জিল (জিলিয়ানের সংক্ষিপ্ত) বলে পরিচয় দিয়ে বললেন, তিনিই আমাদের ট্যুর গাইড। ট্যুরের মাঝে যে কোনো সময় তাকে প্রশ্ন করা যাবে। শুরুতেই তিনি ট্যুর সম্পর্কে হালকা বয়ান দিয়ে বলেছেন, ট্যুর এক ঘণ্টার এবং তিনি ভবনের বিভিন্ন তলার সবগুলো গ্যালারির নির্বাচিত এবং উল্লেখযোগ্য নিদর্শণ দেখাবেন। ট্যুরে আমরা শুধু দু’জন ছিলাম।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাখি বিলুপ্ত মোয়া
অকল্যান্ড ওয়ার মেমোরিয়াল মিউজিয়াম (মাউরি ভাষায় বলা হয় তামাকি পায়েঙ্গা হিরা) অকল্যান্ড ডোমেইনের মধ্যে অবজারভেটরি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। পাহাড়টি প্রায় দেড় শ’ হাজার বছর আগে আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল, যা বর্তমানে ‘কষ্টকর স্মৃতির পাহাড়’ নামে পরিচিত। কেননা এই পাহাড়ের উপরেই নির্মাণ করা হয়েছে ওয়ার মেমোরিয়াল মিউজিয়াম। মিউজিয়ামটি ১৯২০-এর দশকে যুদ্ধক্ষেত্রে যারা যুদ্ধ করেছেন এবং মারা গেছেন, তাদের স্মরণে যুদ্ধ স্মারক হিসেবে তৈরি করা হয়। মিউজিয়ামের ছাদের উপরে রয়েছে তামা ও কাঁচের তৈরি বিশাল গম্বুজ এবং ভেতরে রয়েছে বিগত দেড়শ বছরের সংগৃহীত যুদ্ধের এবং মাউরিদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম ও শিল্পকর্ম।
আমরা জিলকে অনুসরণ করি। তিনি লিফটে আমাদের নিয়ে যান প্রথম তলায়। বিশাল এক কক্ষে দেখা মিলল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মোয়া পাখি, যা বর্তমানে বিলুপ্ত। জিলের কথায় জানতে পারি, এক সময় মোয়া পাখি নিউজিল্যান্ডের বিভিন্ন পরিবেশে বাস করত, যার মধ্যে ছিল বন, ঝোপঝাড় এবং উপ-অ্যালপাইন অঞ্চল। একেক প্রজাতি মোয়া পাখি আলাদা আবাসস্থল পছন্দ করত, কেননা তা নির্ভর করত খাদ্যাভাসের উপর। তারা ছিল নিরামিষ ভোজী এবং পাতা, ফল, বীজ ও ঘাস খেত। সব মিলিয়ে নয় প্রজাতির মোয়া পাখির মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রজাতি প্রায় ৩.৬ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত, যা ইতিহাসে পরিচিত সবচেয়ে উঁচু পাখির তকমা দিয়েছে, এবং ওজন ছিল প্রায় ২৩৫ কিলোগ্রাম। সবচেয়ে ছোট প্রজাতি ছিল প্রায় বন-মোরগের মতো। তারা ছিল উটপাখি, এমু এবং কিউই পাখিদের একই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাদের ডিম ছিল রাগবি বলের মতো বড়। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, পুরুষ মোয়া ডিমের উপর বসে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটাতো, কারণ মহিলা মোয়া পাখি সাধারণত পুরুষ পাখির চেয়ে বড় আকারের ছিল এবং বেশি ওজন হওয়ার জন্য ডিমের উপর বসতে পারত না।
আদিবাসী মাউরিদের বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প
‘মোয়া’ শব্দটি এসেছে পলিনেশীয় মুরগির জন্য ব্যবহৃত শব্দ থেকে। প্রায় পাঁচশ বছর আগে মোয়া পাখির বিলুপ্তি ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে তাদের বিলুপ্তির প্রধান কারণ ছিল মাউরিদের অতিরিক্ত শিকার করার প্রবণতা। কেননা বিশাল আকৃতি এবং উড়তে না পারার জন্য তারা ছিল অত্যন্ত সহজ শিকার। মাউরিরা তাদের মাংস, পালক এবং হাড়ের জন্য শিকার করত, যা খাদ্য, যন্ত্রাংশ এবং অলঙ্কার তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত হতো।
মাউরি সংস্কৃতি এবং ইতিহাসে মোয়া পাখি এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে, কেননা মাউরিদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী গল্প ও প্রবাদে এই পাখির উল্লেখ করা হয়েছে। যখন ১৮৪০ সালে নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত ইউরোপীয়রা প্রথমবার মোয়া পাখির হাড় আবিষ্কার করেছিল। তখন থেকে মোয়া পাখি নিউজিল্যান্ডের জাতীয় প্রতীক হয়ে উঠে। আর এই কারণে নিউজিল্যান্ডকে ‘মোয়াল্যান্ড’ (মোয়ার ভূমি) বলা হয়।
এছাড়া সেই বিশাল কক্ষে কাঁচের বাক্সে রয়েছে কিউই পাখির মূর্তি ও ডাইনোসরের কঙ্কাল। সবাই জানি যে, কিউই হলো নিউজিল্যান্ডের জাতীয় পাখি এবং দেশটির বন্যপ্রাণী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনন্য প্রতীক। কিউইর চোখ শরীরের অনুপাতে খুবই ছোট হয়, তবে ডিম বিশাল আকৃতির, যার ওজন প্রায় ৪৫০ গ্রাম এবং শরীরের ওজনের তুলনায় প্রায় কুড়ি শতাংশ। মহিলা কিউই বছরে একটি মাত্র ডিম পাড়ে। জিল আমাদের কাছে নিয়ে কিউইর সরু লম্বা ঠোঁটের ডগার দু’পাশে দু’টি ছিদ্র দেখিয়ে বলেছে যে, অন্য কোন পাখির ঠোঁটে কোন ছিদ্র নেই। কিউই-এর পাঁচটি প্রজাতি রয়েছে এবং তারা ২৫ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।
সেখান থেকে বেরিয়ে যাই পাশের আরেক কক্ষে। সেখানে রয়েছে মাউরিদের ইতিহাস, বিশেষ করে কীভাবে তারা পলিনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জ থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এসে বসতি স্থাপন করেছে। এছাড়া রয়েছে তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প এবং পাথর থেকে তৈরি করা যন্ত্রপাতি, যা দিয়ে তারা বন্য প্রাণী শিকার করতো। এছাড়া সেখানে রয়েছে আটশ বছর আগে তাইওয়ান ও ফিলিপাইন থেকে আসা মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। আমি পেছনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলাম। একসময় জিল বলল, ছবি পরে তুলতে পারবে। কেননা তোমরা ইচ্ছে করলে আবার এসে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে পারবে এবং তখন ছবি তুলতে পারবে। তোমাদের টিকিট সারাদিনের জন্য। তাই যতক্ষণ খুশি সময় কাটাতে পরো। আমি দুঃখ প্রকাশ করে তাকে অনুসরণ করি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিউই সৈনিকের ডাইয়োরামা বা পিকচার মডেল
তারপর আমরা পুনরায় লিফটে উঠে দোতলায় ‘স্কার্স অন দ্য হার্ট’ অর্থাৎ ‘হৃদয়ে ক্ষত’ গ্যলারিতে যাই। সেখানে একাধিক কক্ষ ও টানা করিডোর রয়েছে। সেসব জায়গায় রয়েছে উনবিংশ শতাব্দীর নিউজিল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ, অ্যাংলো-ব্যোর যুদ্ধ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পূর্ব তিমোর যুদ্ধ, কোরিয়ার যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, এশিয়ার সংঘাত, বিশেষ করে কুয়েত, ইরাক ও আফগানিস্তান, এবং সাম্প্রতিক জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণকারী সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন সরঞ্জাম ও স্মৃতিচিহ্ন। সেসব সরঞ্জাম ও স্মৃতি চিহ্নের মধ্যে রয়েছে ডাইয়োরামা বা পিকচার মডেল এবং অন্যান্য শিল্পকর্ম, সৈনিকদের পোশাক, মেডেল, আগ্নেয়াস্ত্র, কামান, মেশিনগান, বন্দুক, গ্রেনেড, যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি এবং সৈনিকদের ব্যাক্তিগত জিনিসপত্র, যেমন চিঠি এবং তাদের লেখা দিনলিপি।
এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে প্রদর্শণীর জন্য রয়েছে দু’টি যুদ্ধ বিমান।পুরো গ্যালারীর নাম ‘স্কার্স অন দ্য হার্ট’ রাখার কারণ বলার সময় জিলের কণ্ঠস্বর খানিকটা ভারী শোনায় এবং তার চোখেমুখে ফুটে উঠে যুদ্ধের বিভীষিকাময় আতঙ্ক। তার মুখে শুনেছি যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিউজিল্যান্ডের দশ লাখ সৈনিক অংশগ্রহণ করেছিল, যা জনসংখ্যার দশ শতাংশ। এদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের একজন কখনই যুদ্ধ শেষে ঘরে ফিরে আসেনি এবং প্রায় চল্লিশ হাজার আহত হয়েছিল। যারা ফিরে এসেছিল, তাদের অনেকেই পুনরায় স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করেছিল, কিন্তু অনেকের জন্য বেঁচে থাকাটা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেকে আহত হওয়ার জটিলতায় মারা গিয়েছিল। অন্য অনেকেই শারীরিক বা মানসিক ক্ষতের কারণে মদ্যপানের দিকে ঝুকে পড়েছিল।
যারা যুদ্ধ পরবর্তী মানসিক রোগে (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) ভুগছিল, তারা অনেকে শেষপর্যন্ত বেঁচে থাকতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার যুদ্ধের এই দুঃখজনক ঘটনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তারপর আমরা যাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘হল অব মেমোরি’ গ্যালারিতে, যা কোন কক্ষ নয়, বরং বিশাল এক কড়িডোর। সেখানে মাঝামাঝি জায়গায় নির্মিত বেদিতে গোলাকার মানচিত্রের উপর এক ব্যক্তি বিজয়ীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, যা যুদ্ধের বৈশ্বিক পরিসরকে প্রতিফলিত করে। বেদির পেছনের রয়েছে তিনটি রঙিন কাঁচের জানালা এবং সেগুলো বিভিন্ন বাহিনীর নারী সৈনিক, নার্স এবং বাড়িতে থাকা সাধারণ নারী, বয়স্ক ও শিশুদের প্রতীক হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত কামান
এছাড়া বেদির দু’পাশের দেয়ালে নিহত সৈনিকদের নাম মার্বেল পাথরের গায়ে খোদাই করে তামার পাত দিয়ে লেখা রয়েছে। একসময় জিল জানতে চেয়েছেন আমরা জানি কিনা নিউজিল্যান্ডের অধিবাসীদের ‘কিউই’ বলা হয় কেন? আমি রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মুখ নিচু করে থাকি। তবে আমি জানতাম, নিউজিল্যান্ডের অধিবাসীদের কিউই বলা হয়, যেমন বলা হয় অস্ট্রেলিয়ানদের অজি, বৃটিশদের পমি, মার্কিনীদের ইয়াংকি এবং চীনাদের চৈনিক, কিন্তু কিউই নামকরণের কারণ বা পেছনের গল্প জানতাম না। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের জাতীয় পাখি কিউই এবং অন্যতম ফল কিউইয়ের নাম জানতাম।
যাহোক, জিল আমার জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করার জন্য নেপথ্যের কাহিনী বলেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিউজিল্যান্ডের সৈনিকেরা মিত্র বাহিনীর অন্য দেশের (বিশেষ করে ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়া) সৈনিকদের থেকে আলাদা করার জন্য সামরিক পোশাকের গায়ে কিউই পাখির ব্যাজ পড়ত। আর তা দেখে অন্যরা টিটকারী করে তাদের নাম দিয়েছিল কিউই এবং সেই থেকে সৈনিকদের গন্ডি পেরিয়ে সমগ্র নিউজিল্যান্ডের অধিবাসীদের উপনাম হয়ে যায় কিউই।
তবে নিচতলার অকল্যান্ডের গল্প শিরোনামের গ্যালারীর সবচেয়ে দর্শণীয় আইটেম হলো চকমকে তিন রঙের কাঁচের তৈরি তিনটি ইউই (গোত্র)-এর রক্ষাকারী প্রতীক তিনটি ডানাযুক্ত মানু (পাখি)। এদেরকে অকল্যান্ডের বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়গুলোর কাহিনী ও বিবরণ বর্ণনাকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। মাউরি ভাষায় গোত্র তিনটি হলো Ngāti Whātua, Ngāti Paoa ও Waikato-Tainui এবং পাখি তিনটির নাম kahu pokere (লাল), kuaka (নীল) এবং kereku (সবুজ)। ইংরেজিতে এই পাখি তিনটির নাম যথাক্রমে সোয়াম্প হ্যারিয়্যার, বার-টেইলড গডউইট এবং নিউজিল্যান্ড পিজিয়ন। উজ্জ্বল রঙিন কাঁচের পাত দিয়ে পাখি তিনটি তৈরি করেছেন শিল্পী মাইক ক্রফোর্ড।
পাখি এবং মানুষের মধ্যে সম্পর্ক মাউরি জীবনধারা ও সংস্কৃতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত। এই পাখি তিনটির কাহিনী সম্পর্কে মাউরিদের ইতিহাস টেনে জিল বলেছেন যে, kahu pokere আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে ও প্রতীকি অর্থে মৃতদের পরলোকে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে, kuaka পূর্বপুরুষদের অভিবাসনের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখে এবং kereku শান্তি রক্ষাকারী হিসেবে পরিচিত এবং এরা ছিল বন পুনর্জীবনের জন্য অপরিহার্য। তাদের মধ্যে দৃঢ় জোট রয়েছে, যা অংশ, বর্তমান এবং গভীর পূর্বপুরুষের সঙ্গে সম্পর্কিত। মাউরিদের বিশ্বাস মতে পাখি তিনটি পুকেওয়াকা (যে জায়গায় মিউজিয়ামটি নির্মাণ করা হয়েছে) জায়গায় রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত আছে। আর তাই জায়গার প্রতি তাদের আঞ্চলিক অধিকারও রয়েছে। মাউরিদের কাছে পাখি তিনটি অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ, কেননা প্রতিটি পাখি নিজেদের এমন ভূমিকা রেখেছে যে, তাদের একত্রিত করলে একটি চিরন্তন প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় এবং প্রশ্নটি হলো: ‘Ko wai tātou?’ অর্থাৎ ‘আমরা কারা?’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হল অব মেমোরি
একসময় আমাদের মিউজিয়াম দেখা শেষ হয়। ভবনের বাইরে এসে দেখি ঝুম বৃষ্টি। তার সঙ্গে দমকা হাওয়া। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার অজুহাতে পুনরায় ভেতরে ঢুকে ক্যাফেতে বসি এবং সামনে ধূমায়িত কফি ও গরম চকলেটের মগ রেখে আমরা বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করি। প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি বৃষ্টির তেজ তখনো কমেনি।
মিউজিয়ামের ভেতর ট্যুরের আগে একবার স্বল্প সময়ের জন্য স্যুভেনির শপে ঢুকেছিলাম। তখন শুধু দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিয়েছি। ভাবলাম যাওয়ার আগে স্যুভেনির শপ থেকে কিছু উপহার সামগ্রী কিনব। তাই সময় নিয়ে দেখার পরিকল্পনা করে পুনরায় স্যুভেনির শপে প্রবেশ করি। সেখানে বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাওয়া যায়, যার মধ্যে রয়েছে কাঠের খোদাই করা কারুকাজ, পোনামু (বা নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত সবুজ পাথর), হাতে বোনা সামগ্রী, মহিলাদের পোশাক, মাথার রুমাল ও অলংকার, সিরামিক ও কাঁচের তৈরি ভাস্কর্য, শিশুদের জন্য উপহার, যেমন বই, টী-শার্ট, খেলনা, এবং আরও অনেক কিছু। আমরা নাতনি এবং নাতির জন্য কয়েকটি শিশুতোষ গল্পের বই ক্রয় করি। প্রায় এক ঘন্টা পরে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি বৃষ্টির রাগ কিছুটা কমেছে। আর সময় ব্যয় না করে আমরা একটা উবার ডেকে হোটেলে ফিরে আসি।
যাহোক, লেখা শেষ করার আগে স্বীকার করতে হয়, অকল্যান্ড ওয়ার মেমোরিয়াল মিউজিয়াম যে শুধু নিউজিল্যান্ড যুদ্ধের গল্পগাথা এবং স্মৃতি ধরে রেখেছে, তা নয়। বরং একইসঙ্গে দেখা যায় নিউজিল্যান্ডের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য, বিশেষ করে মাউরিদের সংস্কৃতি ও হস্তশিল্পের চমৎকার কারুকাজ এবং পলিনেশিয়ান নাবিকদের বিভিন্ন ধরনের কৃতিত্বের নমুনা।
পুনশ্চ: ট্যুর গাইড জিলের সঙ্গে এক ঘণ্টা উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনি দেখার পর আমরা আরও কিছু দেখার জন্য পুনরায় মিউজিয়ামের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছি। তাই এই লেখা আমাদের একই দিনে দু’বার দেখার অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি তুলে ধরা হয়েছে।