রাজনীতি

‘চট্টগ্রাম বন্দর ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বিএনপি সরকারের অগ্নিপরীক্ষা’

চট্টগ্রাম বন্দর ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বিএনপি সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। এ বিষয়ে অবিলম্বে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। কেননা, এসব চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা আধিপত্য বিস্তার শুরু করে বলে জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

রবিবার (৭ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘দেশ বাঁচাও বন্দর বাঁচাও’ আন্দোলন আয়োজনে বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশীদের হাত থেকে রক্ষার দাবিতে এক প্রতিবাদ সভায় তারা এসব কথা বলেন।

সভায়‌ লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘‘চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের সবচাইতে আধুনিক, নিউম্যুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সবচাইতে আয়বর্ধক এবং সবচাইতে গতিশীল একটা বন্দর। এই বন্দরকে এই মুহূর্তে কারও কাছে ইজারা দেওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে এটি পরিচালনা করছে।’’

বিদেশিদের হাতে বন্দর তুলে দিলে বন্দরের সার্বভৌমত্ব স্পর্শকাতর বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তাসহ বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের দেশ থেকে চলে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। 

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাবো এবং আমরা সবসময় চাইবো যে দেশীয় যেসব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আছে তাদের সক্ষমতা যাচাই করে এ বন্দরকে তাদের দ্বারা পরিচালনা করা হোক।’’

সভায় বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘‘স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও আমরা চট্টগ্রাম বন্দরকে হ্যান্ডেল করার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারিনি, যা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এটি আমাদের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির একটি চালিকা শক্তি ও হৃৎপিণ্ড। এটা কোনোভাবেই আমরা বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে পারি না।’’

বর্তমান বিএনপি সরকারকে এ বিষয়ে চুক্তি বাতিল করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘এমনিতেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম বন্দর লাভজনক প্রতিষ্ঠান। যদি কোনো সীমাবদ্ধতা থেকে থাকে তবে সেটি উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। এটি আমাদের শেষ জায়গা।’’

‘‘চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও উন্নত করতে যা করা দরকার করা হোক। কিন্তু কোনোভাবেই বিদেশিদের হাতে লিজ দেওয়া যাবে না। এটা নিয়ে চিঠি চালাচালির কোনো বিষয় নয়। আমি বিশ্বাস করি সংসদে দেশপ্রেমিক সদস্যরা আছেন তারা একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন। আজ ডিপি ওয়ার্ল্ড নামে যে কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির কথা শোনা যাচ্ছে সেই কোম্পানির সঙ্গে আমেরিকার নৌবাহিনীর সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে সেটিও দাসত্বের তথা অধীনতামূলক চুক্তি। গত ৫৫ বছরে এমন চুক্তি বাংলাদেশে হয়নি,’’ যোগ করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক। 

প্রতিবাদ সভায় জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘‘নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় অর্থনীতির প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান। আমরা বহু বছর ধরে দেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন করে আসছি। অন্তর্বর্তী সরকার তো স্বার্থবিরোধী চুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে দিতে চায়। তারা তো ছিল অনির্বাচিত। এখন নির্বাচিত সরকার কেন সেই চুক্তি বহাল রাখবে? তাহলে ভরসা ও জবাবদিহি কোথায়?’’ 

‘‘দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। কারণ তাদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ফলে সরকারের উচিত হবে এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা,’’ বলেন শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন।

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘‘আমাদের দেখতে হবে জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে কি না, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না। চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের সার্বভৌমত্বের জায়গা। আজ বিদেশিরা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করতে চায়। আমাদের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করেছে, আগের ফ্যাসিস্ট সরকারের ধারাবাহিকতা মাত্র। তো অন্তর্বর্তী সরকারের দেশপ্রেম থাকলে সেই চুক্তি বাতিল করতো। কিন্তু তারা সেটি করেনি। সেজন্য তাদের আমি কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই।’’

বর্তমান সরকারের উচিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারকে দোষী করা উল্লেখ করে রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘‘সময় পেলে ওই সরকারের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। বর্তমান সরকারের আরও উচিত হলো ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে চট্টগ্রাম বন্দরের অব্যবস্থাপনা দূর করে আরও সময়োপযোগী করা। প্রয়োজনে সংসদে আলোচনা করুন।’’

আমেরিকার সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করা হয়েছে সেটিও স্বার্থবিরোধী বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাসদের বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ‘‘সীমান্তে পুশইনের মাধ্যমে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অপচেষ্টা করছে প্রতিবেশী দেশ। যদি কেউ অবৈধভাবে থেকে থাকে সে বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করা দরকার। সেই সঙ্গে আহ্বান থাকবে যেন বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ড চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে লিজ দেওয়া না হয়।’’

সভাপতির বক্তব্যে দেশ বাঁচাও বন্দর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছে। অথচ সেখানে বিনিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, এখন দেশে নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা সবার আগে বাংলাদেশ এই নীতিতে এগিয়ে যাবো। যেখানে মূলত দেশের স্বার্থ প্রাধান্য থাকবে। আমরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও উন্নত করতে চাই।’’

প্রতিবাদ সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য সৈয়দ হাসান মারুফ রুমি ও সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল, বিএনপি নেতা রাশেদ খান প্রমুখ।