স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় এবং জিআই স্বীকৃত উত্তরের বিখ্যাত হাঁড়িভাঙ্গা আম বাজারে আসছে আগামী ১৬ জুন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই আম বিক্রির পরিমাণ দুইশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। তারা জানায়, চলতি মৌসুমে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আমের আবাদ হয়েছে।
সোমবার (৮ জুন) বদরগঞ্জ উপজেলার তেকানি বাজার ও পদাগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন আমবাগান ঘুরে দেখা যায়, শেষ সময়ের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন আম চাষিরা। পাশপাশি পদাগঞ্জ হাটে আম বিপণনের প্রস্তুতিও চলছে। পদাগঞ্জের একটি মাঠে অস্থায়ীভাবে বসে আমের হাট। সে বিষয়ে নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করছে হাট ইজারাদার কমিটি।
হাট ইজারাদার কমিটির দাবি, প্রতিবছরে এই হাট থেকে বিপুল অর্থ ইজারা গ্রহণ করে সরকার, কিন্তু হাড়িভাঙ্গা আমের আধুনিক শেড বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ঝড় বৃষ্টি হলে এই মাঠের হাট স্থানান্তর হয় সড়কে, ফলে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট আর ভোগান্তি।
তেকানি বাজারের আমচাষি আফজাল হোসেন বলেন, “মুকুল আসার পর থেকে কয়েক দফা ঝড় হয়েছে। অনেক আম ঝরে গেছে। এখনো এক সপ্তাহ পর গাছ থেকে আম সংগ্রহ শুরু হবে। টানা বৃষ্টিতে আমের গায়ের রং কিছুটা কালচে হয়ে যাওয়ায় পরিচর্যার অংশ হিসেবে স্প্রে করা হচ্ছে।”
চাষিরা জানান, হাঁড়িভাঙ্গা আম পাকলে সাধারণত তিন থেকে চার দিনের বেশি ভালো থাকে না। কার্যকর সংরক্ষণ পদ্ধতি না থাকায় স্থানীয় চাহিদার বাইরে বড় পরিসরে বাজার সম্প্রসারণ ও রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
হাঁড়িভাঙ্গা আমের প্রবর্তক নফল উদ্দিন পাইকারের ছেলে আমজাদ হোসেন পাইকার বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে শুনছি, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এই আমের সংরক্ষণকাল বাড়ানোর জন্য গবেষণা করছে। এখনো এর বাস্তব সুফল পাইনি। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পরও উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি।”
হাঁড়িভাঙ্গা আমের সঙ্গে কৃষক
তিনি বলেন, “হাঁড়িভাঙ্গার রাজধানীখ্যাত পদাগঞ্জ এলাকায় রাস্তার অবস্থা খারাপ, নেই পর্যাপ্ত আবাসন, ব্যাংকিং সুবিধা কিংবা স্থায়ী বিপণন শেড। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা জরুরি।”
কৃষি বিভাগ ও চাষিদের মতে, জুনের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে বাজারে পরিপক্ব ও উন্নত মানের হাঁড়িভাঙ্গা আম পাওয়া যাবে। এর আগে বাজারে ওঠা আমের বেশিরভাগই অপরিপক্ব হতে পারে। প্রকৃত স্বাদ পেতে জুনের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাঁড়িভাঙ্গা আমের বৈশিষ্ট্য হলো এটি আঁশবিহীন, অত্যন্ত মিষ্টি ও সুস্বাদু। এর আঁটি ছোট, খোসা পাতলা এবং প্রতিটি আমের ওজন সাধারণত ২০০ থেকে ৪০০ গ্রাম। মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি আম ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়। রংপুর সদর, মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতিবছর হাঁড়িভাঙ্গা আমের আবাদ বাড়ছে। অনেক পতিত ও উঁচু-নিচু জমিও এখন আমচাষের আওতায় এসেছে। এই আম চাষ করে উত্তরের অর্থনৈতিক চিত্র অনেকটা পাল্টে গেছে। মৌসুমীভাবে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার লোকের।
রংপুর অঞ্চলে হাঁড়িভাঙ্গার পাশাপাশি ফজলি, সাদা ল্যাংড়া, কালা ল্যাংড়া, মিশ্রিভোগ, গোপালভোগ ও আম্রপালি, বারি ফোরসহ বিভিন্ন জাতের আমের চাষ হয়। জনপ্রিয়তা ও বাজার চাহিদার দিক থেকে হাঁড়িভাঙ্গা শীর্ষে রয়েছে। কয়েক বছর আগে জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর আমটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরো পরিচিতি লাভ করে। সংরক্ষণ প্রযুক্তির অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। চাষি ও ব্যবসায়ীরা আম পরিবহনের জন্য বিশেষ সার্ভিস চালু, হিমাগার নির্মাণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং পদাগঞ্জ হাটে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আল-আমিন হোসেন তালুকদার বলেন, “হাঁড়িভাঙ্গা আমের আঁশ নেই এবং দ্রুত পেকে যায়। ফলে দুই-তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা কঠিন। সংরক্ষণকাল বাড়ানোর লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। এটি সময়সাপেক্ষ হলেও আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে ইতিবাচক ফল পাওয়ার আশা করছি।”
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলন সন্তোষজনক হয়েছে। ১৬ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসবে হাঁড়িভাঙ্গা আম। এর বেচাকেনায় দুইশ কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে। ভবিষ্যতে রপ্তানির বিষয়েও কাজ করছে কৃষি বিভাগ।”
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, “হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাজারজাতকরণ যাতে নির্বিঘ্ন হয়, সে বিষয়টি জেলা প্রশাসন নিবিড়ভাবে তদারকি করবে। পরিবহনে ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।” এই আমের রপ্তানি, সংরক্ষণ সুবিধা ও আধুনিক বাজার অবকাঠামো উন্নয়নে পরিকল্পনা নেওয়া কথাও জানান তিনি।