যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েল যদি ইরানের সঙ্গে আবারো যুদ্ধে জড়ায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পাশে থাকবে না এবং ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ একা লড়তে হতে পারে।
গত এপ্রিল মাসে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর সোমবার (৮ জুন) দুই দেশের মধ্যে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষই হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হয়। এরপরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কড়া অবস্থান সামনে এলো।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠছেন। তিনি নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে উভয় পক্ষকে ‘গোলাগুলি’ বন্ধ করার দাবি জানান। তিনি উল্লেখ করেন, ‘অজ্ঞতা বা বোকামি বাধা হয়ে না দাঁড়ালে’ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চূড়ান্ত কূটনৈতিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ফোন করেও হামলা বন্ধ করতে বলেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, তিনি নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
ট্রাম্প বলেন, “আমি বলেছি, ‘বিবি (নেতানিয়াহু), তোমাকে আরো সতর্ক হতে হবে, অন্যথায় খুব শিগগির তোমাকে একাই লড়তে হবে’।।
রবিবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর একটি ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হামলার পর এই নতুন উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় সম্মত হওয়া ইরান এই হামলার জবাবে উত্তর ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার রাতেই ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ফোন করে পাল্টা হামলা না চালানোর অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুরোধ উপেক্ষা করে সোমবার ভোরে ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং একটি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় বিমান হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইরানও ইসরায়েলের হাইফা শহরের একটি কারখানা এবং দুটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।
এই সামরিক সংঘাতের পর নেতানিয়াহু এক টেলিভিশন ভাষণে ট্রাম্পের চাপকে কিছুটা হালকা করার চেষ্টা করে বলেন, “ইসরায়েলের আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং আমরা সেটাই করছি।”
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নেতাদের মধ্যে উত্তেজনার খবরকে হালকা করে দেখিয়ে ফক্স নিউজকে বলেন, “কখনও কখনও প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যেও ঝগড়া হয়।”
তিনি বলেন, নেতানিয়াহু ট্রাম্পের অনুরোধে ‘উত্তেজনা কমাতে’ সম্মত হলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘খুব ভালো করেই’ বোঝেন যে ইসরায়েল ‘জবাব না দিয়ে নিজের দেশে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মেনে নিতে পারে না’।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ওয়াশিংটনকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েলের এই আগ্রাসন থামাতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে পর্দার আড়ালে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখনও কূটনৈতিক আলোচনা চলছে বলে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত নিশ্চিত করেছেন।
সোমবারের এই সংঘাতের রেশ ধরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং লোহিত সাগরে ইসরায়েলি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলি হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৪ জন লেবানিজ নাগরিক নিহত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিলিস বেনিস ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারিকে কেবলই ‘রাজনৈতিক চাল’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “যতদিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে তাদের যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহিতা থেকে রক্ষা করবে, ততদিন ট্রাম্পের মুখের এই মৌখিক হুঁশিয়ারির আসলে কোনো বাস্তব মূল্য নেই।”