২০২৪ সালের ১০ এপ্রিল। পবিত্র রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের ছুটির সময়। এক মাস আগে ইসরায়েলি সেনাদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে গাজার একজন সরকারি কর্মচারীকে মারধর, নির্যাতন, হাত-পা বাঁধা এবং মলত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছিল।
ওই দিন সেনারা এবং তাদের পাহারাদার কুকুরগুলো তাকে ঘিরে ফেলেছিল।
দিনটির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “ডানদিকে ছয়জন এবং বামদিকে ছয়জন সেনা ছিল। তারা আপনার নাম জিজ্ঞাসা করত। আপনি যদি ‘মুহাম্মদ’ বলতেন, তারা বলত, ‘না, বল, তোর নাম বেশ্যা’।”
আল-বাকরি নামের ওই কর্মকর্তা জানান, তাকে আরো সাতজন বন্দির সাথে রাখা হয়েছিল। তাদের সবাইকে বিবস্ত্র করে, চোখে পট্টি বেঁধে এবং হাতে হাতকড়া পরানো হয়েছিল।
তিনি বলেন, “আমাদের পোশাক খুলে ফেলার পর ধর্ষণ করা হয়েছিল। আমরা ‘হে প্রভু, হে আল্লাহ’ বলে চিৎকার করছিলাম, কিন্তু তারা শুধু হাসছিল এবং আমাদের ভিডিও করছিল।”
এরপর আল-বাকরি সেই একই কথা বলেন যা বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও জানিয়েছে – বন্দিদের যৌন নির্যাতনের সময় প্রহরীরা কুকুরও ব্যবহার করত।
তিনি বলেন, “কুকুরগুলো অফিসারদের নির্দেশ মেনে আমাদের আক্রমণ করছিল। কোনো দয়া ছিল না। আমরা প্রায় ২০ মিনিট থেকে আধ ঘণ্টা ধরে সেই যৌন নির্যাতন ও মারধরের মধ্যে ছিলাম। তারপর তারা আমাদের পোশাক পরতে বলে কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।”
আল-বাকরি সেইসব প্রাক্তন বন্দিদের মধ্যে একজন, যারা ‘বডিজ অফ এভিডেন্স: ইসরায়েল’স ডার্কেস্ট ওয়েপন’ নামক একটি তথ্যচিত্রের জন্য আল জাজিরাকে বিস্তারিত সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই তথ্যচিত্রটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর বিচারক, জাতিসংঘ এবং অধিকৃত অঞ্চলের বিশেষ র্যাপোর্টার ফ্রান্সেসকা আলবানিজের ভাষ্যমতে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের ব্যবহারের বিষয়ে অনুসন্ধান করে। প্যালেস্টাইনিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস (পিসিআর) এবং ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বন্দিদের সাক্ষ্য নথিভুক্ত করেছে, যেখানে তারা বর্ণনা করেছেন কীভাবে ইসরায়েলি সেনারা তাদের ধর্ষণের জন্য কুকুর ব্যবহার করেছিল।
ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয় – এর স্বরূপ কয়েক দশক পুরোনো। কিন্তু আল জাজিরার তদন্ত এবং জাতিসংঘ ও শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের ব্যবহার বাড়িয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি সেনাদের মাধ্যমে যৌন, প্রজনন এবং অন্যান্য ধরনের লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ‘পদ্ধতিগত’ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মে মাসে, ইসরায়েলকে জাতিসংঘের ‘সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতার কালো তালিকা’-য় যুক্ত করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’ৎসেলেম এবং পিএইচসিআর ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে, বিশেষ করে ফিলিস্তিনি বন্দিদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে যৌন সহিংসতার ব্যাপক সংস্কৃতির কথা বর্ণনা করেছে। ইসরায়েলের প্রশাসনিক আটক ব্যবস্থার অধীনে অনেককে বিনা অভিযোগে গ্রেপ্তার করে আটক রাখা হয়েছিল।
ফিলিস্তিনিদের যৌন নির্যাতনের দায়ে কোনো সৈন্য বা প্রহরী দোষী সাব্যস্ত হননি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে নেগেভ মরুভূমির সদে তেইমান আটক শিবির থেকে এক বন্দিকে ধর্ষণের একটি ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর ইসরায়েল ১০ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে আটক করে। কিন্তু আইনপ্রণেতাসহ ডানপন্থী বিক্ষোভকারীদের দল প্রহরীদের মুক্ত করার জন্য সেই শিবিরে হামলা চালানোর চেষ্টা করে।
গত জুলাই মাসে ইসরায়েল প্রহরীদের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়। হামলার ভিডিওটি ফাঁস করার অভিযোগে অভিযুক্ত নারী কর্মকর্তা মেজর-জেনারেল ইয়েফাত তোমের-ইয়েরুশালমিকে পরবর্তীতে গ্রেপ্তার করা হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তার এই ‘অপরাধকে’—ইসরায়েলি সেনাদের মাধ্যমে সংঘটিত ধর্ষণের ফুটেজ শেয়ার করাকে—দেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘সবচেয়ে গুরুতর জনসংযোগ আক্রমণ’ হিসেবে আখ্যা দেন।