সারা বাংলা

পদাগঞ্জে হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাজারে নেই বিক্রয় শেড

নানা সংকট, অব্যবস্থাপনা আর প্রশাসনিক উদাসীনতার মাঝেই নাকে ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে উত্তরের ঐতিহ্য হাঁড়িভাঙ্গা আম। জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১৬ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসছে সুমিষ্ট এই আম। এবারো এই আমকে ঘিরে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বিশাল বাণিজ্যের প্রত্যাশা করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। তবে, শত কোটি টাকার এই বিরাট অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের মূল কেন্দ্রে নেই ন্যূনতম কোনো বিক্রয় শেড। ফলে বছরের পর বছর ধরে চলা অবহেলা আর ভোগান্তি মাথায় নিয়েই আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা শুরু করছেন এবারের মৌসুম।

বুধবার (১০ জুন) সকালে ​সরেজমিনে রংপুরের বদরগঞ্জের বিখ্যাত পদাগঞ্জ হাটে গিয়ে দেখা যায়, আদিম ও করুণ চিত্র। আধুনিক অবকাঠামো তো দূরের কথা, মাঠের কাদা-মাটি ও ধুলাবালির মধ্যেই সনাতন পদ্ধতিতে কোদাল ও সুতা-রশি টানিয়ে অস্থায়ী মৌসুমি দোকানের সীমানা নির্ধারণ করছেন হাট ইজারাদার কমিটি। 

স্থানীয়রা জানান, হাট ইজারাদার কমিটির এই নিছক পরিকল্পনা সামান্য বৃষ্টির পানিতেই ভেস্তে যায়। একটু বৃষ্টি হলেই মাঠটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তখন নিরুপায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে আম নিয়ে বসেন মূল সড়কের ওপর। ফলে পুরো বাজার জুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বড় বড় ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যবস্থায় চরম দুর্ভোগ নেমে আসে। তাদের অভিযোগ, এই ভোগান্তির কারণে দেশের ভালো মানের পাইকার ও আড়তদারেরা পদাগঞ্জ হাটে আসতে চান না।

পদাগঞ্জ হাটে কথা হয় হাট ইজারাদার রাশিদুল ইসলাম ও স্থানীয় ইউপি সদস্য ফেরদৌস রহমানের সঙ্গে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গেল বছর এই হাটটির ইজারা ডাক হয়েছিল ৫৭ লাখ টাকা। প্রতিবছর সরকারের এত বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় হলেও হাটের অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন বারবার এখানে আধুনিক আম শেড নির্মাণের আশ্বাস দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে প্রতি আমের মৌসুমে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয় হাট কমিটিকে।

আরো পড়ুন: ১৬ জুন বাজারে আসছে হাঁড়িভাঙ্গা, ২০০ কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা

​স্থানীয় ইউপি সদস্য ও আম ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন বলেন, “শুধুমাত্র হাটের সঠিক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের থাকার জন্য কোনো আবাসিক আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় জিআই স্বীকৃতি মেলা হাঁড়িভাঙ্গার কাঙ্ক্ষিত বাজার মূল্য মিলছে না পদাগঞ্জে। ফলে আম চাষিরা বাইরের বড় পাইকার না পেয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে যৎসামান্য দরেই আম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।”

বৃষ্টি হলেও আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে বসেন মূল সড়কের ওপর

​এদিকে, ​হাঁড়িভাঙ্গা আমের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এতে কোনো আঁশ নেই। ফলে আম হারভেস্ট অর্থাৎ গাছ থেকে পাড়ার পর এটি বেশিদিন রাখা যায় না; মাত্র দুই থেকে তিনদিনের মধ্যেই আম গলে বা নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করে। 

আম চাষিদের অভিযোগ, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এক দশক ধরে এই আমের আঁশ সংযুক্তকরণ এবং এর ‘শেলফ লাইফ’ (সংরক্ষণকাল বা স্থায়িত্ব) বাড়ানো নিয়ে গবেষণার কথা বলে আসছে। আজ পর্যন্ত চাষিদের ভাগ্যে কোনো কাঙ্ক্ষিত বৈজ্ঞানিক ফলাফল মেলেনি।

বাগানিদের ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগের প্রতিও। জিআই পণ্যের স্বীকৃতি মিললেও আম কীভাবে আন্তর্জাতিক মানের বা রপ্তানিমুখী করতে হবে, সে বিষয়ে চাষিদের কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে না। যার দরুণ বিশ্ববাজারে হাঁড়িভাঙ্গার যে বিপুল সম্ভাবনা ছিল, তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ বাগান মালিকদের।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আনুষ্ঠানিক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আল-আমিন হোসেন তালুকদার জানান, হাঁড়িভাঙ্গা আমের লাইফ লাইন নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম চলমান। খুব অচিরেই এই আমের ইতিবাচক ফল আসবে বলে আশা তার।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জানান, এবার রংপুর জেলায় প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষ হয়েছে। সাম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়া ও ঝড়ের কবলে পড়লেও ফলন বেশ ভালো হয়েছে। এবার এই আম থেকে প্রায় আড়াইশো কোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এই আম পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে রপ্তানির প্রক্রিয়া চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।

​রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, হাঁড়িভাঙ্গা আমের রপ্তানি বাণিজ্যের বিষয়টি নিয়ে তারা আন্তরিক। পদাগঞ্জ হাটের দীর্ঘদিনের শেড সংকট ও কাদা-মাটির সমস্যার সমাধানসহ ব্যাংকিং সেবার বিষয়ে আশ্বাস দেন তিনি।