চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা পারভীন বেগম। হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি গত ১৪ মে রাতে মারা যান। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করেন তার স্বজনেরা। কিন্তু ৫০ কিলোমিটার রাস্তার জন্য ভাড়া চাওয়া হয় ৩০ হাজার টাকা। পরে সাড়ে ৯ হাজার টাকায় ভাড়া মিটিয়ে স্বজনেরা পারভীন বেগমের মরদেহ নিয়ে বাড়ি রওয়ানা হন।
পরে এই প্রতিবেদকের কাছে তারা বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, মাত্র ৫০ কিমি দূরত্বের পথে ভাড়া কী করে ৩০ হাজার টাকা হয়? রামেকে এমন ঘটনা নতুন নয়। অনেকের অভিযোগ, রামেকে অ্যাম্বুলেন্সের বিশাল সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছেন রোগী এবং রোগীর স্বজনেরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতাল থেকে কোনো মৃতদেহ বা ছাড়পত্র পাওয়া রোগী বের হলে মৌমাছির ঝাঁকের মতো ঘিরে ধরেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা। একবার যে ভাড়া বলবে সে ভাড়ায় যেতে তারা বাধ্য করে। অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স তখন কোথাও যেতে রাজী হয় না। এই সিন্ডিকেট বেশ শক্তিশালী। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ম্যানেজ করেই চলছে তারা।
মাথায় গাছের ডাল ভেঙে পড়ে গুরুতর আহত হন মালেকা বেগম (৫৫)। রামেক হাসপাতালে ভর্তির পর টানা ১৪ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে তিনি মারা যান। নিহত মালেকার বাড়ি পাবনার সুজানগর উপজেলার কালিকাপুর গ্রামে। হাসপাতাল থেকে শেষ যাত্রা, বোনকে নিয়ে ফিরতে হবে বাড়ি। তাই মর্গের সামনে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষায় বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বোন রাজিয়া খাতুন। তার এই কান্নার কারণ অ্য়াম্বুলেন্স চালকের অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাজিয়া খাতুন বলেন, আইসিউতে থাকা অবস্থায় অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখন বাড়ি নিয়ে যাবো সেই অ্যাম্বুলেন্স ভাড়াও অনেক চাচ্ছে। আমার কাছে এত টাকা নেই। আকুতি-মিনতি করেও লাভ হচ্ছে না। ৩০ হাজার টাকার নিচে অ্যাম্বুলেন্স যেতে চাচ্ছে না।
১২০০ শয্যার এই সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী মারা যান। গেল ১৫ দিনে এখানে মারা গেছেন ৪৯০ জন। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ মানুষ বাড়ি ফিরলেও, মৃতদেহ কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের বাড়ি ফেরার একমাত্র ভরসা লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। আর এই অ্যাম্বুলেন্স ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ও বেপরোয়া সিন্ডিকেট।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রামেক হাসপাতালে ১০ জনের একটি চক্র এই অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ করছে। চক্রটি প্রভাবশালী। তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা করে না। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে কয়েজনের নাম এসেছে। তারা হলেন, সুমন, ডালিম, বাদশা, সাদ্দাম, বিপ্লব ও নিপুন। এর মধ্যে সুমনের রয়েছে ১১টি এবং বিপ্লব ও নিপুনের রয়েছে ৪টি করে অ্যাম্বুলেন্স।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৩৫ টাকা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটার ৩০ টাকা নির্ধারিত। কিন্তু কোনো চালক এই নিয়ম মানছেন না। শুধু তাই নয়, বাইরে থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। কেউ যদি বাধ্য হয়ে বাইরের কোনো কম ভাড়ার অ্যাম্বুলেন্স আনতে যান, তবে সিন্ডিকেটের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়, এমনকি মারধরের শিকারও হতে হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে কেউ মারা গেলেই দালাল ও ওয়ার্ড বয়দের মাধ্যমে দ্রুত খবর চলে যায় সিন্ডিকেটের হোতাদের কাছে। এরপর স্বজনদের বাধ্য করা হয় তাদের সিন্ডিকেটের অ্যাম্বুলেন্স নিতে। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার একটি বড় অংশ কমিশন হিসেবে চলে যায় চক্রটির পকেটে।
পাশাপাশি রয়েছে ময়নাতদন্তের নামে চাঁদাবাজি। সরকারি হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পূর্ণ ফ্রি হলেও প্রতিটি লাশের জন্য ডোমকে দিতে হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এছাড়া ট্রলিম্যানরা রোগীকে ওয়ার্ডে নেওয়া বা অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়ার জন্যও স্বজনদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করেন। এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ মানুষই নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র হওয়ায় এমন লাগামহীন খরচে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিন্ডিকেটের মূল হোতা বলে পরিচিত সুমন ও ডালিম। তাদের দাবি, তারা কোনো সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন না। হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী ভাড়া নিচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. হাসানুল হাসিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। তিনি জানান, অ্যাম্বুলেন্স চালকরা অনেকেই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালায়। তাদের গাড়িতে চলাচল করা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির বলেন, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিষয়টি সমাধানের জন্য ইতিমধ্যেই ট্রাফিক বিভাগকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অচিরেই এই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।