বিনোদন

ফুটবল নিয়ে নির্মিত সেরা ১০ সিনেমা

চার বছর পরপর ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে জন্ম নেয় নতুন নায়ক, তৈরি হয় স্মৃতি, আর লেখা হয় অসংখ্য গল্প। প্রিয় দলের জার্সি, প্রিয় তারকার নাম আর গোলের উল্লাসে মেতে ওঠে কোটি কোটি মানুষ। বিশ্বকাপের এই আবেগ শুধু মাঠ বা গ্যালারিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্র জগতেও।

ফুটবলকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমা ও ডকুমেন্টারি কেবল খেলার গল্প বলে না। এগুলো মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, দেশপ্রেম, সাফল্য-ব্যর্থতা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও তুলে ধরে। কখনো যুদ্ধের মধ্যেও ফুটবল হয়ে ওঠে আশার প্রতীক, কখনো দরিদ্র এক কিশোরের বিশ্বজয়ের স্বপ্নকে তুলে আনে, আবার কখনো ফুটবল কিংবদন্তিদের জীবনসংগ্রামকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয় দর্শকদের কাছে।

ছাব্বিশের ফুটবল বিশ্বকাপের অপেক্ষার এই সময়ে ফিরে দেখা যেতে পারে এমন কিছু সিনেমা ও ডকুমেন্টারি, যেগুলো শুধু ফুটবলপ্রেমীদেরই নয়, যে কোনো দর্শককে খেলার ভেতরের মানবিক গল্প, আবেগ ও ইতিহাসের আরো কাছাকাছি নিয়ে যাবে। এমন কিছু চলচ্চিত্র নিয়ে এই প্রতিবেদন—

যুদ্ধের মধ্যেও ফুটবলের জয়: এস্কেপ টু ভিক্টরি

১৯৮১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘এস্কেপ টু ভিক্টরি’ ফুটবলভিত্তিক চলচ্চিত্রের অন্যতম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে এবং হলিউড তারকা সিলভেস্টার স্ট্যালোন। সিনেমাটিতে দেখা যায়, নাৎসি বন্দিশিবিরে আটক মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের নিয়ে একটি ফুটবল দল গঠন করা হয়। একটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে শুরু হয় স্বাধীনতার লড়াই। ফুটবল এখানে শুধু খেলা নয়, বরং প্রতিরোধ ও আশার প্রতীক।

গোল! দ্য ড্রিম বিগিনস: স্বপ্ন দেখার সাহসের গল্প

ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ‘গোল! দ্য ড্রিম বিগিনস’ একটি আবেগের নাম। ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র সান্তিয়াগো মুনিয়েজ, যে দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে ইংল্যান্ডের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে। বিশ্বকাপের সময় বিশ্বের নানা প্রান্তের লাখো তরুণ যে স্বপ্ন দেখে, এই সিনেমা যেন সেই স্বপ্নেরই প্রতিচ্ছবি। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের বাস্তব খেলোয়াড়দের উপস্থিতি সিনেমাটিকে আরো বাস্তবধর্মী করে তুলেছে।

দ্য ড্যামড ইউনাইটেড

দ্য ড্যামড ইউনাইটেড: কোচের চোখে ফুটবল

ফুটবলের নেপথ্যের নাটকীয়তা বুঝতে চাইলে দেখা যেতে পারে ‘দ্য ড্যামড ইউনাইটেড’ সিনেমা। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কোচ ব্রায়ান ক্লাফের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় নিয়ে নির্মিত এ চলচ্চিত্রে ফুটবলের ক্ষমতার লড়াই, নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাত ফুটে উঠেছে। খেলোয়াড়দের বাইরেও যে কোচরা ফুটবলের ইতিহাস বদলে দেন, এই সিনেমা তার অনন্য এক উদাহরণ।

পেলে: দ্য বার্থ অব আ লিজেন্ড: বস্তির ছেলে থেকে ফুটবলের রাজা

ফুটবলের ইতিহাসে পেলের নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। ‘পেলে: দ্য বার্থ অব আ লিজেন্ড’ চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে তার শৈশব, দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম এবং বিশ্ব ফুটবলের শিখরে ওঠার গল্প। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকে চমকে দেওয়া পেলের গল্প শুধু একজন খেলোয়াড়ের নয়; এটি অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্পও।

নেক্সট গোল উইন্স: হারের মধ্যেও জয়ের গল্প

সব ফুটবল কাহিনি ট্রফি জয়ের নয়। কিছু গল্প আছে, যেখানে লড়াইটাই সবচেয়ে বড় অর্জন; ‘নেক্সট গোল উইন্স’ এমনই একটি গল্প। আমেরিকান সামোয়ার জাতীয় দল একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হারের রেকর্ড গড়েছিল। কিন্তু সেই দলই কীভাবে নিজেদের সম্মান ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে, সেই মানবিক গল্প তুলে ধরেছে এই ডকুমেন্টারি।

ডিয়াগো ম্যারাডোনা: মানুষ না মিথ?

ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে নিয়ে যত গল্প, তত বিতর্কও। ‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা’ ডকুমেন্টারিতে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভাবান এই খেলোয়াড়ের উত্থান, খ্যাতি, ব্যক্তিগত সংকট এবং জীবনের অন্ধকার দিকগুলো উঠে এসেছে। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল কিংবা একক নৈপুণ্যে করা সেই বিখ্যাত গোল—সবই ফুটবল ইতিহাসের অংশ। তবে এই ডকুমেন্টারি দর্শকদের দেখায়, কিংবদন্তির আড়ালেও একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন।

বেন্ড ইট লাইক বেকহাম: ফুটবলার থেকে সাংস্কৃতিক তারকা

ফুটবলারদের মধ্যে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়া নামগুলোর একটি ডেভিড বেকহাম। ‘বেকহাম’ ডকুসিরিজে উঠে এসেছে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখার পর সমালোচনার ঝড়, জাতীয় বীর হয়ে ওঠা এবং পরবর্তী জীবনের গল্প। এটি শুধু ফুটবল নয়; খ্যাতি, পরিবার ও মানসিক দৃঢ়তার গল্পও।

বেন্ড ইট লাইক বেকহাম

ক্যাপ্টেনস অব দ্য ওয়ার্ল্ড: কাতার বিশ্বকাপের ভেতরের গল্প

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপকে ঘিরে নির্মিত ‘ক্যাপ্টেনস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ ডকুসিরিজ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়। এখানে বিভিন্ন দলের অধিনায়ক, কোচ ও খেলোয়াড়দের চোখে দেখা বিশ্বকাপের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। ড্রেসিংরুমের উত্তেজনা, চাপ, হতাশা ও উদ্‌যাপনের মুহূর্তগুলো দর্শককে নিয়ে যায় টুর্নামেন্টের একেবারে ভেতরে।

দ্য কিপার

ষাটের দশকের জার্মান ফুটবল ইতিহাসের বাস্তব একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ‘দ্য কিপার’ সিনেমা। সিনেমাটির মূল চরিত্র বার্ট ট্রাউটম্যান, তিনি ছিলেন সাবেক জার্মান সেনা সদস্য, পরবর্তীতে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির কিংবদন্তি গোলরক্ষক। যুদ্ধবন্দি জীবন থেকে শুরু করে শত্রু দেশ ইংল্যান্ডে গিয়ে ফুটবল খেলার সুযোগ পাওয়া—এই যাত্রা সহজ ছিল না। স্থানীয় দর্শকদের প্রতিবাদ, সামাজিক বিরোধিতা এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্যেও ট্রাউটম্যান কীভাবে নিজেকে প্রমাণ করেন, সেটাই সিনেমাটির মূল গল্প। ফুটবল বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপটে এই সিনেমা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, ফুটবল শুধু গোল বা ট্রফির গল্প নয়, এটি ক্ষমা, পুনর্মিলন এবং মানবিক সম্পর্কের গল্পও।

শাওলিন সকার

গল্পের শুরু এক ব্যর্থ কিন্তু স্বপ্নে ভরপুর মানুষ সিংকে দিয়ে। একসময় তিনি ছিলেন শাওলিন কুংফুর প্রতিভাবান শিষ্য, কিন্তু সময়ের ধাক্কায় হারিয়ে ফেলেন নিজের পরিচয় আর আত্মবিশ্বাস। জীবনের এক মোড়ে তার দেখা হয় ফংয়ের সঙ্গে—একজন সাবেক ফুটবল খেলোয়াড়, যার ভেতরে অসাধারণ প্রতিভা থাকলেও দুর্নীতি আর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ক্যারিয়ার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

এই দুই ভাঙা স্বপ্নের মানুষ একসঙ্গে গড়ে তোলে এক অদ্ভুত কিন্তু সাহসী পরিকল্পনা—যদি শাওলিন কুংফুর শক্তি আর ফুটবলের খেলা একসঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যেতে পারে। এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় এক অনন্য যাত্রা। হারানো বিশ্বাস, ভাঙা স্বপ্ন আর নতুন এক লক্ষ্য; সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অদ্ভুত দল, যারা ফুটবল মাঠে লড়াই করে শুধু জয়ের জন্য নয়, নিজেদের আবার খুঁজে পাওয়ার জন্যও। এই সিনেমাটি তাদের জন্য, যারা স্পোর্টস আর অ্যাকশন, দুই ঘরানার মিশেলে ভিন্নধর্মী গল্প দেখতে পছন্দ করেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের অপেক্ষায় দিন গুনছে ফুটবল বিশ্বকাপ। মাঠে নতুন নায়ক জন্ম নেবে, নতুন ইতিহাস লেখা হবে। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ফুটবলের সেই আবেগকে ছুঁয়ে দেখতে চাইলে এসব সিনেমা ও ডকুমেন্টারি হতে পারে অনন্য সঙ্গী। কেননা বিশ্বকাপ শেষ হয়, ট্রফি হাতবদল হয়, কিন্তু ফুটবলের সেরা গল্পগুলো থেকে যায়। কখনো গ্যালারির স্মৃতিতে, কখনো মানুষের হৃদয়ে, আর কখনো রুপালি পর্দায়; যেখানে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, বরং মানবজীবনের এক অনন্ত চিত্র।