শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তায় কিছু বিষয় ভালো মনে হলেও প্রকৃত অর্থে এটি একটি প্রতারণার বাজেট হয়েছে বলে মনে করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
শুক্রবার (১২ জুন) বিকালে রাজধানীর বাংলামোটরে দলটির অস্থায়ী কার্যালয়ে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গে দলীয় প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন এনসিপির ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ও সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ।
এসময় তিনি বলেন, ‘‘বাজেটে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়নি বরং আমরা চরমভাবে হতাশ এবং আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি। আমরা মনে করি এই বাজেটে যদিও কিছু ভালো দিক আছে, বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তায় কিছু বিষয় মনে হলেও প্রকৃতার্থে কেউ বিশ্লেষণ করলে দেখবে, এটি একটি প্রতারণার বাজেট হয়েছে।’’
‘‘বাজেটের আকার কাল্পনিক ও ইউটোপিয়ান হয়েছে। এটি ইশতেহারভিত্তিক বাজেট হয়েছে। একটা কথা আছে, যত বড় বাজেট, তত বড় নেতাকর্মীদের পকেট ভারী। এটি করা হয়েছে কিনা সেটিও এখন একটি প্রশ্ন।’’
সরকারের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এত বড় বাজেটের টাকা কোথা থেকে আয় করবেন? আপনি হয়তো এনবিআরকে একটি লক্ষ্যমাত্রা দিলেন যে, আমাদের এত টাকা দেবেন। কিন্তু এনবিআরকে যে সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেটিতে বড় বাধা দেওয়া হয়েছে, এবং আপনারা বড় দল হিসেবে কোনো কথা বলেননি। ফলে এখনকার যে লক্ষ্যমাত্রা, এটি কোনোভাবেই আদায় করা সম্ভব নয়। শেষ বাজেটে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ হয়েছে। ফলে এখনো অর্ধেক বাজেট মিসিং রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা আহরণে যে সিস্টেমের কথা বলা হয়েছে, এতে আমাদের হিসেবে সর্বোচ্চ চার লাখ কোটি টাকা আয় করা যাবে। তার মানে এখানে আড়াই লাখ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। ফলে কয়েকদিন পর সরকার টাকা না থাকায় বাজেট কাটছাঁট করবে বলে উল্লেখ করেন আতিক মুজাহিদ।
তিনি আরো বলেন, ‘‘বাজেট ঘাটতির সাথে ব্যাংক ঋণের একটি ইস্যু আছে। আমাদের ১০ লাখের অধিক বৈদেশিক ঋণ আছে। স্থানীয়ভাবে ৮ লাখ কোটি টাকা ঋণ ব্যাংকিং খাত থেকে নিয়েছেন। আবার যদি এক লাখ বাড়ে, এভাবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকের থেকে যদি ঋণ নিতে থাকেন, তাহলে ব্যাংকের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?’’
‘‘আমাদের অনেক ব্যাংক ডেথ। ফলে এখান থেকেও ঋণ না পেলে বিকল্প হিসেবে আপনাকে টাকা ছাপাতে হবে। যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, কিন্তু আপনি বলছেন, ঘাটতি কমিয়েছি। এটিও জনগণের সাথে একটি প্রতারণার। নতুন নিয়ম করা হয়েছে, ব্যাংক একাউন্ট খুলতে গেলে টিএইএন সার্টিফিকেট লাগবে। ফলে মানুষ ফরমাল চ্যানেলে যে টাকা লেনদেন করবে সেটাও করতে তারা ভয় পাবে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের অনেকে করের ভয়ে তা করবে না। ফলে ইনফর্মাল ইকোনোমি বেশি হয়ে গেলে এটা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’’
এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘‘বিভিন্ন গবেষণায় আমরা দেখেছি, ঢাকা শহরে বসবাস করতে অন্তত ৩৬ হাজার টাকা লাগে। ফলে আমরা বলেছিলাম, করমুক্ত আয়সীমা যেন ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা রাখা হয়। কিন্তু সেটি এবার মাত্র ২৫ হাজার বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার করা হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ধরে করলেও তো ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা হয়। ফলে আপনি ৩১ হাজার টাকার মতো আয় করলেই আপনাকে করের আওতায় আসতে হবে। আমি প্রথমেই বলেছি, এই বাজেট একটি প্রতারণার শামিল বাজেট। কারণ আপনার আয়ের সোর্স ক্লিয়ার না।’’
সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, বাজেটটি জনকল্যাণমুখী হওয়ার পরিবর্তে একটি জনতুষ্টিমূলক বাজেটে পরিণত হয়েছে। গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন লুটতরাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি যেভাবে দুর্বল করেছে, অর্থনীতিকে বৈদেশিক ঋণ এবং সুদ নির্ভর করেছে। সেই প্রেক্ষিতে আমাদের এই বাজেটটি হওয়া দরকার ছিল একটি ট্রান্সফরমেটিভ বা রূপান্তরগামী বাজেট। যেটি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে ভিত্তিটা ধ্বংস হয়েছে, সে ধ্বংসস্তূপ থেকে অর্থনীতিকে টেনে তুলবে। কিন্তু বাজেটে অর্থনীতির ভিত্তির দিকে, মূল স্টেকহোল্ডারদের দিকে না তাকিয়ে এটি ম্যানিফেস্টো নির্ভর, একটি বড় এবং শ্বেতহস্তীর মতো বাজেট করা হয়েছে।